পরিপার্শ্ব
রিতেষ কুমার বৈষ্ণব
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:২৫ এএম
অলঙ্করণ : প্রবা
হারুনী। হাওরবেষ্টিত একটি ছোট্ট গ্রাম। হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ের ৬নং কাগাপাশা ইউনিয়নের অন্তর্গত। এখানে বছরে ৬ মাস পানি আর ৬ মাস কাদামাটির সঙ্গে লড়াই করেই গ্রামবাসীর জীবনযাপন করতে হয়। গ্রামে কৃষক, শ্রমিক, মৎস্যজীবী, সরকারি চাকরিজীবীসহ রয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার কয়েকশ সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার। মুক্তিযুদ্ধে এই গ্রামের বাসিন্দাদের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। গ্রামের মানুষের গর্ব—এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন ৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনজন এখনও জীবিত আছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত গ্রামটিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপরের স্তরের শিক্ষাগ্রহণার্থীদের হাওর পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা সদরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের প্রধান সড়কে পৌঁছতে গ্রাম থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা পথ পাড়ি দিতে হয়। কোনোরকম যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় এই শিক্ষার্থীকে। তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীরও নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, মৎস্যজীবীদের মাছ বিক্রি, কৃষকের ফলানো সবজি বাজারজাতকরণসহ কৃষিপণ্য সরবরাহেও পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি।
কত পরিবর্তন চারদিকে
অথচ ৫২ বছরেও উপজেলা
সদরের সঙ্গে গ্রামবাসীর যোগাযোগব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। গ্রামের বাসিন্দা ব্রজেন্দ্র
দাসের দাবি, স্বাধীনতার পর
থেকে হারুনী গ্রামের সঙ্গে
উপজেলা সদরের যোগাযোগব্যবস্থা সচল
রাখতে সামান্য পথ নির্মাণের
জন্য গ্রামবাসীর আবেদন
নির্বাচন এলেই গুরুত্ব পায়, কিন্তু
নির্বাচন শেষে তা আর
বাস্তবায়িত হয় না। এমনকি
প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ মহামারিতেও
কেউ এসে খোঁজ নেন
না গ্রামবাসীর, যেমনটি দেখা
গেছে গত করোনাকালে। গ্রামের
বাসিন্দা বয়োবৃদ্ধ জামিনী দাসের
মন্তব্য, এসব নিয়ে কথা
বলে আর কী হবে। এত বছর কষ্টে
গেলে, বাকি কয়েকটা দিনও
চলে যাবে। ১৫-২০
বছর আগে প্রয়াত মন্ত্রী
বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বানিয়াচং
থেকে মার্কুলী পর্যন্ত রাস্তার
সঙ্গে হারুনী গ্রামকে সংযুক্ত
করার আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু তাও
আর আলোর মুখ দেখেনি।
সারা বছর কাদামাটি আর আফালের ঢেউয়ের সঙ্গে সংগ্রামে অভ্যস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু লাল দাসের আক্ষেপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ মহামারিতেও আমাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই, চলাচল করার রাস্তা নেই। এত বছরে যা হয়নি, আমরা জীবিত থাকতে তা হবে—এমন আশা আর করি না এখন। গ্রামের আশপাশে কোথাও নেই কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ক্লিনিক। হঠাৎ কেউ মারাত্মক অসুস্থ হলেও পায় না প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু। গ্রামের গর্ভবতী মহিলাদেরও ভরসা রাখতে হয় ভাগ্যের ওপর। ৬নং কাগাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এরশাদ আলীও বলেন, জন্মের পর থেকেই রাস্তাটি এ রকম দেখছি। তবে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়নের সব গ্রামে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে এখানেও রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে তার আশ্বাস থাকলেও, তা কবে হবে সে নিশ্চয়তা আপাতত কেউই গ্রামবাসীকে দিতে পারছেন না।
লেখক : সংবাদমাধ্যমকর্মী