× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থ পাচারকারীদের হাত কত লম্বা?

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২২ ১২:৫০ পিএম

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২২ ১৩:১৪ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

শৈশবে গ্রামে দেখেছি সিঁধেল চুরি আর গরু চুরির হিড়িক। আজ রাতে এই বাড়িতে সিঁধ কেটেছে তো কাল ওই বাড়িতে। আজ এই বাড়ির গোয়াল ফাঁকা হয়েছে তো কাল ওই বাড়ির। তবে গরু চুরির বিষয়ে ভিন্নতর একটা দৃশ্যও আমাদের চোখে পড়ত। তা হচ্ছে, গৃহস্থ জেনে যেতেন তার চুরি হওয়া গরুটি কোথায় এবং কার কাছে আছে। কারণ চোর গরু চুরি করে নিয়ে তার বাড়িতে গরু রাখত না। রাখত তার বিশ্বস্ত কারও বাড়িতে। কোনো সূত্রে গরু চোর গৃহস্থকে জানিয়ে দিত তোমার গরু কাল এই সময় পর্যন্ত অমুকের বাড়িতে থাকবে। গৃহস্থ দৌড়াত ওই বাড়ি এবং গরুগুলোর জন্য কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসত। চোরের হাত থেকে যে ব্যক্তি এই গরুগুলো রাখত তাকে বলা হতো ‘থাইব্বলদার’।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজকাল এই ‘থাইব্বলদারদের’ আর দেখা পাওয়া যায় না। মনে হচ্ছে, গ্রামবাংলার থাইব্বলদাররা এখন উন্নত দেশে স্থানান্তর হয়েছে। আর গরু চোররা রয়ে গেছে বাংলাদেশে। এই থাইব্বলদার হচ্ছে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশের কিছু ব্যাংক। তবে বাংলাদেশের অর্থচোরদের লেবাস যে গরু চোরদের মতো নয়, সেটা তো সহজেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের ওই লোকগুলো তাদের অবৈধ আয়ের টাকা এখন মালয়েশিয়া কিংবা সুইস ব্যাংকে জমা রাখছে। জমাকৃত অর্থ থেকে অর্জিত মুনাফা বাংলাদেশের আমানতকারীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশে যখন ডলার সংকট চলছে, বাংলাদেশ যখন তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, ঠিক তখন হাজার হাজার কোটি টাকা সেই থাইব্বলদারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া দেশকে অচল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তবে ‘চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি’ বলে একটা কথা আছে। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। প্রতি বছরই অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকার পরিমাণ শুধু বাড়ছেই। যতই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হোক না কেন, যতই সংশোধনের আহ্বান জানানো হোক না কেন, টাকা পাচার বন্ধ হচ্ছে না। পাচারকারীদের কানে যেন তুলো দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে সংবাদ হচ্ছে, এ বছর আগের বছরের তুলনায় অত কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে। ওই যে গরু চোররা থেকে যেত অন্ধকারে, হাল আমলের টাকা চোররাও থেকে যায় অন্ধকারে। ‘থাইব্বলদার’ আবার আইনগতভাবে নিজেদের ‘থাইব্বলদারি’ বাণিজ্য ঠিকই করে যেতে পারছে। মাঝখান থেকে সম্পদ হারাচ্ছে গৃহস্থ অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশ। ভাবা যায়! বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকেই জমা আছে ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। আমাদের দেশে টাকা রাখা হয়তো অনেকে নিরাপদ মনে করে না। ট্যাক্স বা আইনি ঝামেলা, জবাবদিহিতা এড়াতে, অবৈধভাবে আয় করা টাকা ট্যাক্সের আওতায় না আনা বিভিন্ন কারণে বাইরে টাকা পাচার করে। যারা টাকা পাঠান, তাদের নাম-পরিচয় জানা যায় না, এটা তাদের জন্য বড় সুবিধা। এসব সুবিধার জন্য তারা বিদেশে টাকা রাখেন। যেখানে অবৈধ টাকা আয়ের সুযোগ আছে, সেখান থেকেই টাকা চলে যাওয়ার কথা আসে।

প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এই পাচারকৃত অর্থ আগের বছরের চেয়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মনে করার কারণ নেই, ওই সময় শুধু এই ৩ হাজার কোটি টাকাই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে শুধু সুইস ব্যাংকের তথ্যই জানা গেছে। কিন্তু এশিয়ার একাধিক দেশেও এভাবে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার যাচ্ছে। আর সেই ‘থাইব্বলদারদের’ নামও জানতে পারছে না বাংলাদেশের মানুষ। নাম কিন্তু কোনো না কোনোভাবে জানা হয়েই যেত। তাহলে আধুনিক সুযোগ হাতে থাকার পরও বাংলাদেশ কোনো কারণে টাকা পাচারকারীদের নাম জানতে পারছে না। কিংবা কোন কোন সূত্র থেকে সুইস ব্যাংকের ওই টাকাগুলো গেছে, তা বের করাও কি এতটাই কঠিন বিষয়? বাংলাদেশ থেকে এই টাকাগুলো জমার সূত্র হিসেবে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীনরা বলেন, বিদেশে অবস্থানকারীরা এই টাকা সরিয়েছে। আবার কখনও বলা হয়, এই টাকা আন্ডার ইনভয়েস কিংবা ওভার ইনভয়েস মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়েছে।

বিদেশে অবস্থানকারী বাঙালি কারও কাছ থেকে এই টাকা গেছে, এটা আদৌ কি বিশ্বাসযোগ্য? তাহলে বাকি থাকে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হওয়ার বিষয়টি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় অধিকাংশ টাকাই হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়ে গেছে। এই হুন্ডি ব্যবসার খবর সচেতন অনেকেই জানেন। কিন্তু তাদের টিকিটিও ধরার কোনো ক্ষমতা কি বাংলাদেশের নেই? এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ের বিষয়টি অনেকেই আলোচনা করেন। হয়তো তাদের ব্যর্থতার মাত্রাটাও একটু বেশি। তা নাহলে তারা সেগুলো ধরতে পারছেন না কেন। এদিকে সরকার টাকা ফেরত আনার একটি বড় অপশন এবারও খোলা রেখেছে। চলতি বাজেটে এসব পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এখনও শুনতে পারিনি কী পরিমাণ টাকা বাংলাদেশে ফেরত এসেছে। কিংবা আদৌ সেই টাকা বাংলাদেশে ফেরত আসবে কি না। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘সুইস ব্যাংকে কার বা কোন প্রতিষ্ঠানের টাকা, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে তথ্য চাইতে পারে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ।’ এমন পরিস্থিতিতে ১১ আগস্ট দেশের উচ্চ আদালত সরকারকে বলেছেন, সুইস ব্যাংকে অবৈধ পথে বাংলাদেশিরা যেসব অর্থ জমা রেখেছেন বা পাচার করেছেন সেসব বিষয়ে সরকার এবং দুদক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা জানতে চেয়েছেন। সময়ও বেঁধে দিয়েছেন আদালত। হয়তো সরকার আদালতের কাছে তাদের পক্ষ থেকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করবে। অন্য অনেক প্রতিবেদনেও জানা গেছে, বাংলাদেশিদের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে গেছে। এটা বিশ্বাস করতে হবে সুইস ব্যাংকে পাচার করা টাকা আছে। দুর্নীতিবাজ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ীদের টাকা আছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই তথ্য চাওয়া উচিত। তবে সব টাকাই কিন্তু পাচার করা টাকা নয়। অনিবাসী বা দেশের টাকাও থাকতে পারে।

আমরাও তেমন কিছু দেখার পর এটা কি বলতে পারব, জমা হওয়া টাকার পরিমাণ অনেক কম। কিংবা পাচার হওয়া টাকাগুলো ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়েছে কি? অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব ঢাকায় নিযুক্ত সুইস রাষ্ট্রদূত নাথালি চুয়ার্ড জানিয়েছেন এসব টাকা কীভাবে জমা হয়েছে, কারা জমা করেছেন এ বিষয়ে কোনো তথ্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাওয়া হয়নি এই পর্যন্ত। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, সুইজারল্যান্ডের সংবিধান এবং ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকের হিসাবধারীদের তথ্য প্রকাশ করার বিধান নেই। কিন্তু সেটাও কি ধোপে টেকার মতো? কারণ সুইস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য, সেই অপরাধ সুইজারল্যান্ডই হোক আর অন্য কোনো দেশেই হোক। ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো অর্থ স্থানান্তর হলে তা ধরতে পারা সম্ভব। কিন্তু বিকল্প কোনো চ্যানেলে দেশ থেকে টাকা চলে গেলে তার খবর বাংলাদেশ ব্যাংকের জানা কঠিন। তবে অসম্ভব কিছু নয়। অর্থ পাচারকারীদের হাত কি অনেক লম্বা?

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি একযোগে কাজ করে, তাহলে তথ্য জানা অসম্ভব বিষয় হবে না। যেহেতু সুইস ব্যাংকেরই বিধান আছে অপরাধ তদন্তের প্রয়োজনে তারা গ্রাহকদের তথ্য প্রকাশ করতে পারে, আর সেই সুযোগটি যদি বাংলাদেশ গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশের অপরাধীদের চিহ্নিত করা অসম্ভব কিছু নয়। অবৈধ অর্থ জমা দেওয়ার ব্যাংক হিসেবে সুইস ব্যাংকের খ্যাতি বেড়ে যাওয়ায় অর্থ পাচারকারীরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি অন্য দেশের ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তাই এই মুহূর্তে যদি বিষয়টি সম্পর্কে দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যেতে পারে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে এই টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও সরকার গ্রহণ করতে পারে। অবৈধভাবে পাচার হওয়া আরাফাত রহমান কোকোর টাকা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের সক্ষমতার বিষয়টি অচিন্তনীয়, এমন ভাবার কারণ নেই। সেই উদ্যোগটি যদি সুইস ব্যাংকে জমা হওয়া টাকার ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা হয় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সুবার্তা মিলবে।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

/এসআর

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা