আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ০২:৩৯ এএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ০৯:২৫ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
৮ জানুয়ারি ১৯৭২ ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি লন্ডন পৌঁছায়। তিনি উঠলেন লন্ডনের অভিজাত হোটেল ক্লারিজেসে। ক্লান্ত বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম কিন্তু ততক্ষণে খবর রটে গিয়েছে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা লন্ডনে। তাঁকে এক নজর দেখতে রাস্তায় লেগে গেল ভিড়। হোটেল কক্ষে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু অবহিত হয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব সম্পর্কে। কথা বলে নিয়েছেন কয়েকজন নেতার সঙ্গেও। বঙ্গবন্ধু ততক্ষণে অন্য উচ্চতায়। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ঠিক যেমন একজন রাষ্ট্রনায়কের দেওয়া উচিত। বিশ্বের মানুষ অন্য আর এক বঙ্গবন্ধুকে চিনল, শুনল, জানল।
পরদিন ৯ জানুয়ারি। লন্ডন সময় রাত ৮টা। বাংলাদেশে তখন রাত ২টা।
ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া একটি বিশেষ কমেট বিমানে জাতির পিতা লন্ডনের হিথ্রো
বিমানবন্দর থেকে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের পথে রওনা হন। লন্ডন ত্যাগের আগে তিনি
দেখা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের সঙ্গে। হীথ তখন অন্য
শহরে ছুটি কাটাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু দেখা করতে চান শুনে তিনি ছুটি বাতিল করে ছুটে আসেন
১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। গাড়ির দরজা খুলে নিজে রিসিভ করেন বাঙালির মহানায়ককে। সেই রাতে
বাংলাদেশের অনেক মানুষ নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। অনেকে নফল নামাজ পরেছেন, রোজা রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটির প্রথম গন্তব্য ভারতের রাজধানী দিল্লি। মাঝপথে
জ্বালানি নেওয়ার জন্য কিছুক্ষণের যাত্রাবিরতি সাইপ্রাসের নিকোশিয়া ও বাহরাইনে।
লন্ডন ছাড়ার আগে ভারতের হাইকমিশনার টেলিফোনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর
সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। ত্রিশ মিনিট ধরে চলে সেই আবেগঘন আলোচনা।
১০ জানুয়ারি সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি
দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সব প্রটোকল ভেঙে পালাম বিমানবন্দরে তখন
উপস্থিত ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। আছেন মন্ত্রিপরিষদের
সদস্যবৃন্দ। বঙ্গবন্ধু আভিধানিক অর্থে তখন একজন নির্বাচিত শপথ না নেওয়া সংসদ সদস্য, একজন সিভিলিয়ান।
দিল্লি বিমানবন্দরে এই সময় ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ
সোনিয়া গান্ধী তখন সন্তান সম্ভবা। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বায়না ধরলেন তিনি দিল্লির
পালাম বিমানবন্দরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকতে। বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে
সোনিয়াকেও বিমানবন্দরে আনা হলো। দেখলেন তিনি তাঁর জীবনের প্রথম একজন মহানায়ককে। এর
দুদিন পর প্রিয়াঙ্কার জন্ম। একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে যেসব প্রটোকল দেওয়া হয় ঠিক একই
প্রটোকল দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানানো হয় বিমানবন্দরে। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব
ফারুক চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে লিখেছেনÑ (সকাল) আটটা বেজে দশ মিনিট। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া
রুপালি কমেট বিমান। ধীরে ধীরে এসে সশব্দে সুস্থির। তারপর শব্দহীন কর্ণভেদী নীরবতা।
সিঁড়ি লাগল। খুলে গেল দ্বার। দাঁড়িয়ে সহাস্যে, সুদর্শন, দীর্ঘকায়, ঋজু, নবীন দেশের
রাষ্ট্রপতি। অকস্মাৎ এক নির্বাক জনতার ভাষাহীন জোয়ারের মুখোমুখি। সুউচ্চ কণ্ঠে
উচ্চারণ করলেন তিনি আবেগের দুটি শব্দ। ‘জয় বাংলা’।
বিমান হতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা
জানান ভারতের রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সম্মানে কামান দাগা হয় একুশবার।
তারপর একটি চৌকস সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার। দিল্লিতে প্রথমবারের মতো
সেনাবাহিনীর ব্রাস ব্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজানো হলো ‘আমার সোনার
বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। বিমান থেকে নামার পর সব প্রটোকল শেষে বঙ্গবন্ধুকে
নিয়ে যাওয়া হয় পাশের সেনানিবাসের ময়দানে। সেখানে সেই শীতের সকালে উপস্থিত কয়েক
হাজার জনগণের উদ্দেশে তিনি বক্তব্য রাখবেন। কিছুটা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। তবে বাদ
গেলনা কোনো প্রসঙ্গ। ভারত সরকারের সাহায্য আর ভারতের আপামর গণমানুষের সহায়তা আর
ত্যাগের কথা। কথা ছিল তিনি ইংরেজিতে ভাষণ দেবেন। কিন্তু অনেকটা জনগণের দাবিতে তিনি
বললেন বাংলায়। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
সিদ্ধার্থ শংকর রায় অনুরোধ করেছেন বঙ্গবন্ধু যেন যাত্রাপথে কলকাতা হয়ে যান। বিনয়ের
সঙ্গে তিনি জানালেন যেই রাজ্যের মানুষ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এত ত্যাগ স্বীকার
করেছেন তাদের পৃথকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে তিনি অতিসত্বর কলকাতা আসবেন।
ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধু
ঢাকা পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতির বিশেষ বিমান ‘রাজহংসে’ ভ্রমণ করবেন আর
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিমানটি দিল্লি থেকে লন্ডন ফিরবে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ
প্রধানমন্ত্রীর বিমান থেকে সব মালপত্র ‘রাজহংসে’ তোলা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু এই সময় জানিয়ে দিলেন বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করার জন্য ভারত সরকারের
প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ তবে যাত্রার মাঝপথে ব্রিটিশ বিমান ছেড়ে দেওয়াটা অসৌজন্যমূলক হবে।
সুতরাং বাকি পথটাও তিনি একই বিমানে যাবেন। আবার মালপত্র স্থানান্তর হলো। এ ঘটনাকে
বলা যেতে পারে বঙ্গবন্ধুর বিদেশনীতির গোড়াপত্তন।
পড়ন্ত বিকালে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি তেজগাঁও
বিমানবন্দরে অবতরণ করল। বিমানের দরজা খুলল। দরজায় এসে দাঁড়ালেন ইতিহাসের বরপুত্র
শেখ মুজিব, যাঁর জন্য
দেশের কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন প্রবাসী
সরকারের নেতারা। দেওয়া হলো নতুন
দেশের চৌকস নতুন সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনার। বাজল ‘আমার সোনার
বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। জনগণের নেতাকে
জনগণ দেখতে চায়। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে খোলা ট্রাক রওনা হলো রমনা
রেসকোর্সে, যেখানে লাখো
জনতা তাদের মহানায়কের জন্য অপেক্ষা করছেন। এই যেন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পুনরাবৃত্তি।
কী হতো বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা হত্যা করলে? তিনি যদি
কারাগার থেকে মুক্ত না হতেন? একান্ন বছর পর চিন্তা করলে উত্তরে তেমন ভালো একটা
কিছু পাওয়া কঠিন। প্রবাসী সরকার গঠন করার সময় কারা সরকার গঠন করবে তা নিয়ে কিছু
টেনশন তো ছিলই। একদিকে আওয়ামী লীগের ভেতর একটি মহল চেয়েছিল বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকে
নিয়ে একটি সরকার গঠন করা হোক। সেনাবাহিনীর একাংশ চেয়েছিল সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে
একটি বিপ্লবী কমান্ডো কাউন্সিল হোক। এমনটি হলে বিশ্ব মনে করত এটি কোনো স্বাধীনতা
সংগ্রাম নয়,
এটি
একটি সেনা বিদ্রোহ। এই দুটার কোনোটাই হলে ভারতের সহায়তা পাওয়া অসম্ভব হতো। শুধু
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দিয়ে
সরকার গঠন করাই সর্বোত্তম বিকল্প। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা
গান্ধীরও একই মত। তাই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনেই সেদিন এইসব
সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তখন হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্র।
বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ক্ষমতার টানাটানিতে দেশে শুরু হতে পারত এক ভ্রাতৃঘাতী
গৃহযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বের কাছে সব পরাভূত হয়। তাঁর ডাকে
মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে।
দেশে তখন কয়েক হাজার ভারতীয় সৈন্য। অন্য দেশের সৈন্য
অপ্রয়োজনে আরেক দেশে থাকলে প্রশ্নবিদ্ধ হয় সেই দেশের সার্বভৌমত্ব। এটা মানতে রাজি
নন বঙ্গবন্ধু। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পরিষ্কার ভাষায় জানান
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আগেই ভারতীয় সৈন্য নিজ দেশে ফিরে যাবে। কথা রেখেছিলেন
ইন্দিরা গান্ধী। ১২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতের বিদায়ী সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে
সালাম জানালেন। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। বঙ্গবন্ধু হাত দিয়েছিলেন একটি
সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পনর্গঠন কাজে। সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি যত
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলেন তাঁকে হত্যা-পরবর্তীকালে অন্য কোনো
সরকারকে এতসব কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি। হাজারো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে
তাঁর সেই সাড়ে তিন বছর ছিল সার্বিক বিচারে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ
শাসনকাল। বঙ্গবন্ধু আর আমাদের মাঝে ফিরবেন না কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পদচিহ্ন
বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ অধ্যায়ের পর বঙ্গবন্ধুকে
মুছে ফেলার কত অপচেষ্টাই তো হয়েছে। কিন্তু কুচক্রীরা সফল হয়নি। দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে সংবিধানের
(পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ প্রণয়নের
মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে তার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ, প্রদর্শনের
বিধান যোগ করায় পুনঃপ্রত্যাবর্তন হয় মহানায়কের।
প্রয়াত মহানায়কের কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে
পরপর তিন মেয়াদে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। এই তিন মেয়াদে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে
গিয়েছেন অন্য উচ্চতায়। তার হাত ধরে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে ৩৫তম অর্থনীতির দেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক
অর্থনীতি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ বলেছে ২০৪০ নাগাদ আমাদের
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে। তবে এর জন্য চাই যোগ্য ও ব্যক্তি স্বার্থত্যাগী
নেতৃত্ব, যা প্রদর্শন
করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এক বছর পর পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচন বানচাল
করতে অনেক রাজনৈতিক ও সুশীল পরগাছা এক হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সব ষড়যন্ত্র মোকবিলা
করে পুনরায় ফিরতে হবে পিতার আসনে, যেমনটি তিনি করেছিলেন দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে।
বাংলা ও বাঙালির জয় হোক। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি অমর হোক। জয় বাংলা।
লেখক : শিক্ষাবিদ, বিশ্লেষক ও গবেষক