আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৭:০০ পিএম
আহমেদ তোফায়েল। ফাইল ছবি
বিশ্ব অর্থনীতি এখন বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য আর আগের মতো নেই। বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্ব নড়েচড়ে বসেছে। এখন অনেক দেশই বিকল্প মুদ্রা ও নতুন পেমেন্ট নেটওয়ার্ক খুঁজছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বাংলাদেশে সফরে এসেছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এই আলোচনার মূল বিষয় দুটি। একটি হলো ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস), অন্যটি পান্ডা বন্ড।
চীন এখন বিশ্বজুড়ে তাদের মুদ্রা ইউয়ান ছড়িয়ে দিতে চায়। তারা নিজস্ব আর্থিক অবকাঠামো বাড়াতে মরিয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশও ডলারসংকট মোকাবিলা করতে চায়। আমরাও বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণ করতে চাই। তবে এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ আমাদের জন্য কতটা বাস্তবসম্মত? এর ভেতরের অর্থনৈতিক সমীকরণই বা কী? এটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড আসলে কী
সহজ কথায়, সিআইপিএস হলো চীনের নিজস্ব পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। এটি আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম সুইফটের মতো একটি ব্যবস্থা। কোনো দেশের ওপর সুইফট ব্যবহারে বাধা এলে সিআইপিএস কাজে দেয়। ডলার এড়িয়ে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন করতে চাইলে এটি ব্যবহার করা যায়।
অন্যদিকে পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের একটি বন্ড। বিদেশি কোনো সরকার বা কোম্পানি চীনা মুদ্রা ইউয়ানে এই বন্ড ইস্যু করে। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার চীনের বাজার থেকে ইউয়ান সংগ্রহ করতে চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারবে। চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান এর প্রধান বিনিয়োগকারী।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে একটি নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খুলেছে। আমাদের কিছু ব্যাংকও সীমিত পরিসরে এটি ব্যবহার করছে। তবে এই ব্যবস্থার সফল ব্যবহার এখনো অনেক কম। এর মূল কারণ মার্কিন ডলারের ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।
বাণিজ্যের অসমতা ও মুদ্রার সংকট
চীনের প্রস্তাবিত সিআইপিএস আমাদের জন্য একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে বাণিজ্যের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। বাংলাদেশ ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক মোটেও সমান নয়। চীন থেকে আমরা প্রচুর পণ্য আমদানি করি। কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের রপ্তানি খুবই কম।
ইউয়ানে লেনদেন করতে চাইলে আমাদের ইউয়ান রিজার্ভ থাকতে হবে। আমরা যদি রপ্তানি করে ইউয়ান আয় করতে না পারি, তবে আমদানি মূল্য মেটাবো কীভাবে? তখন ঘুরেফিরে সেই ডলার দিয়েই ইউয়ান কিনতে হবে। এই বাস্তবতায় শুধু নতুন পেমেন্ট চ্যানেল চালু করলেই ডলারের চাপ কমবে না।
গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, এই বিকল্প ব্যবস্থার সুবিধা পুরোপুরি নির্ভর করবে বাণিজ্য ও পুঁজির প্রবাহের ওপর। চীন যদি বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ করে এবং সেই ঋণ ইউয়ানে দেয়, তবেই এই উদ্যোগ সফল হবে।
বিনিয়োগ ও প্রকল্প অর্থায়নের হিসাব
চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দল শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথেই বৈঠক করেনি। তারা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজার সাথেও বসেছে। এর অর্থ হলো—চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত ঋণ বাড়াতে চায়।
বাংলাদেশ যদি চীনের বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যু করে, তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে? সংগৃহীত ইউয়ান দিয়ে যদি চীনের কাছ থেকেই যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়, তবে রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। বাংলাদেশে চলমান চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এই অর্থ বিনিয়োগ করা যায়। এতে দেশের শিল্পায়ন গতি পাবে।
তবে মনে রাখতে হবে, বন্ডের সাথে সুদহার ও ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা জড়িত থাকে। পান্ডা বন্ডের খরচ যদি ডলারের চেয়ে বেশি হয়, তবে তা দেশের জন্য ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সুইফটের বিকল্প খোঁজার ঝুঁকি
সুইফট ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সিআইপিএস ব্যবহার করা বেশ সংবেদনশীল বিষয়। বাংলাদেশ সিআইপিএসে যুক্ত হলে তা হবে আমাদের দ্বিতীয় বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থা। এটি দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কোনো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লে দেশের বাণিজ্য সচল থাকবে।
তবে এই পদক্ষেপের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ একটি রপ্তানিমুখী দেশ। আমাদের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। আমাদের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে ডলারে। তাই এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না, যা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আমাদের নিজস্ব স্বার্থই সবার আগে দেখতে হবে।
করণীয় ও সম্ভাব্য সমাধান
চীনের সাথে এই আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংককে এই প্রস্তাবের ভালো-মন্দ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পান্ডা বন্ডের খরচ ও সুদের হার আমাদের অনুকূলে আছে কি না, তা দেখতে হবে। চীন থেকে সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ইউয়ানে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চীনের দেওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে পারলে ইউয়ান আয় বাড়বে।
এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চীনে খোলা নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট সচল করতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের এই নতুন লেনদেন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত যেন সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থে নেয়া হয়। কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক পক্ষ নেওয়া যাবে না। পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সাথে সমান ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আজকের দিনে কোনো একক মুদ্রার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়। লেনদেনের মাধ্যম বহুমুখীকরণ আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো একটি ঢাল। চীনের সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড আমাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দূরদর্শী কূটনীতি প্রয়োজন। একই সাথে আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। তবেই আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়ে যেতে পারব।
লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনর বাংলাদেশ