× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

দেশে নীরবে ঘটছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিপ্লব

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আহমেদ তোফায়েল। ফাইল ছবি

আহমেদ তোফায়েল। ফাইল ছবি

চার বছর আগের কথা। আবদুর রহিম নামের ঢাকার একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জরুরি প্রয়োজনে প্রথমবারের মতো একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ নেন। ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র এক হাজার টাকা। এটি ছিল সম্পূর্ণ জামানতহীন ঋণ। এর জন্য তাকে কোনো ব্যাংকের বারান্দায় ঘুরতে হয়নি। পাতার পর পাতা ফরম পূরণ করার ঝামেলাও ছিল না। হাতের স্মার্টফোনে কয়েকটা ট্যাপ করেই তিনি টাকাটা পেয়ে যান। 

আবদুর রহিম সময়মতো ঋণ শোধ করতেন। এই ভালো অভ্যাসের কারণে তার ঋণসীমা ধীরে ধীরে বেড়েছে। এখন তার ক্রেডিট লিমিট দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার টাকায়। উৎসবের ছুটিতে প্রথাগত ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকে। গভীর রাতেও হঠাৎ টাকার প্রয়োজন পড়তে পারে। আবদুর রহিমের মতো লাখো মানুষকে এখন আর কারও কাছে হাত পাততে হয় না। ডিজিটাল ন্যানো লোন এখন তাদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সুরক্ষা দিচ্ছে।

রহিমের ঘটনাটি কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এক বিশাল রূপান্তরের গল্প। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এই সেবা শুরু হয়। মোবাইল আর্থিক সেবা বিকাশ এবং বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক যৌথভাবে এটি চালু করে। এটি দেশের প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও জামানতবিহীন ঋণ সেবা। শুরুতে মাত্র ২ লাখ গ্রাহককে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু হয়েছিল। চার বছরের মাথায় এই প্রকল্প মাইলফলক ছুঁয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসের তথ্য পাওয়া গেছে। ডিজিটাল ন্যানো লোন বিতরণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ৫০০ টাকা থেকে শুরু হওয়া একটি সেবা এখন মহিরুহ। এটি আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক নীরব বিপ্লব।

আমাদের প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা বড় শিল্পগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল। তারা করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে ঋণ দিতে পছন্দ করে। দেশের সব ব্যাংক মিলিয়ে প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে। এর বিপরীতে ডিজিটাল ন্যানো লোন প্ল্যাটফর্মের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সেবার আওতায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ গ্রাহক ঋণ পাচ্ছেন। তারা বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সহজে আবেদন করেন। প্রতিটি গ্রাহক গড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে ঋণ নিচ্ছেন। সিটি ব্যাংকের তথ্য আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে তাদের ১ কোটি ২ লাখের বেশি গ্রাহক এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য। এ পর্যন্ত ৩৫ লাখের বেশি গ্রাহক এই সুবিধা নিয়েছেন। 

প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে এই ডিজিটাল ঋণের মূল পার্থক্য গতিতে। এখানে কোনো কাগজের নথিপত্র লাগে না। কোনো গ্যারান্টারেরও প্রয়োজন হয় না। ব্যাংক এখানে উন্নত অ্যালগরিদম ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে। গ্রাহকের লেনদেনের আচরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্য দেখা হয়। আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাসও বিবেচনা করা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ক্রেডিট স্কোর নির্ধারিত হয়। এই স্কোরিং মডেলটি নিখুঁত ও কার্যকর। দেশের ব্যাংকিং খাতে বিশাল খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি রয়েছে। তার বিপরীতে এই ডিজিটাল ঋণের খেলাপি হার মাত্র ১ শতাংশের নিচে। ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণের পর মাত্র ৮০ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এই পোর্টফোলিও প্রশংসনীয় ও শক্তিশালী।

এই ডিজিটাল ঋণের বড় সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করছে। সাধারণত ব্যাংকিং সেবার সিংহভাগ সুযোগ ঢাকা বা চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক হয়। কিন্তু বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের তথ্য ভিন্ন কথা বলে। এই ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় অর্ধেক অংশ ঢাকার বাইরে গেছে। অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ছোট শহর ও গ্রামে বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ প্রসারিত হয়েছে।

এখানে আরও একটি আশাব্যঞ্জক তথ্য আছে। ঋণগ্রহীতাদের এক-চতুর্থাংশের বেশি হলেন নারী। আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চান। তারা প্রায়শই উচ্চ সুদের অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতেন। ডিজিটাল ন্যানো লোন তাদের সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিচ্ছে। নারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তারা এই অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করছেন। উদাহরণস্বরূপ, কাঁচাবাজারের একজন সবজি বিক্রেতার কথা ধরা যাক। তিনি সকালে ৫ হাজার টাকা ঋণ নিলেন। পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনে এনে সারাদিন বিক্রি করলেন। দিন শেষে বা সপ্তাহ শেষে তিনি সেই টাকা পরিশোধ করে দিলেন। এই সামান্য চলতি মূলধন তার ব্যবসাকে সচল রাখছে। এটি তাকে মহাজনের চড়া সুদের কবল থেকে রক্ষা করছে। এই ধরনের হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোগের সামগ্রিক প্রভাব বিশাল। তারা দেশের জিডিপিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন।

ডিজিটাল ন্যানো লোনের ক্ষেত্রে বার্ষিক ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ সুদ নেওয়া হয়। এটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ব্যাংক ঋণের চেয়ে বেশি মনে হতে পারে। তবে ভেতরের অঙ্কটি বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এটি গ্রাহকের জন্য মোটেও বোঝা নয়। এই ঋণের মেয়াদ মাত্র ৩ থেকে ৬ মাস। বেশিরভাগ গ্রাহকই ৩ মাসের মধ্যে ঋণ শোধ করে দেন। এই হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। ১০ হাজার টাকা ঋণ নিলে ৩ মাসে সুদসহ ফেরত দিতে হয় প্রায় ১০ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসের জন্য জরুরি অর্থের খরচ মাত্র ৪০০ টাকা।

প্রথাগত পদ্ধতিতে ১০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করতে গেলে ফি দিতে হয়। সেই খরচের তুলনায় এই ডিজিটাল ঋণের ব্যয় যৌক্তিক। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখানে সময়ের কোনো অপচয় নেই। নির্ধারিত সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ করলে কোনো অতিরিক্ত চার্জ বা জরিমানা কাটা হয় না। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা খরচ অনেকাংশে কমে এসেছে। এই সুফল সরাসরি পাচ্ছেন সাধারণ ও প্রান্তিক গ্রাহকরা।

বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে শত বছর ধরে মহাজনী প্রথা চলছে। স্থানীয় সুদের ব্যবসা গ্রামীণ মানুষকে ঋণের জালে আটকে রাখে। এমনকি এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণও অনেক সময় মানসিক চাপের কারণ হয়। উচ্চ সেবা মাশুল ও কঠোর কিস্তির কারণে মানুষ সমস্যায় পড়ে। ব্যাংকাররা এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। ২০৩০ বা ২০৩১ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ মানুষ ন্যানো লোন পাবেন। এটি হলে অপ্রাতিষ্ঠানিক মহাজনরা অনেকাংশে বিলুপ্ত হয়ে যাবেন। স্থানীয় ঋণদান সমিতিও তাদের কার্যকারিতা হারাবে। এমনকি প্রচলিত এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ বাজারের একটি বড় অংশ ন্যানো লোনের দখলে চলে আসবে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও মুক্ত ও গতিশীল করবে।

বর্তমানে দেশে জাতীয় পরিচয়পত্রধারী প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৬৬ লাখ। দেশে এমএফএস ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ৮ কোটিরও বেশি। সেই তুলনায় ১ কোটি ২ লাখ যোগ্য গ্রাহকের সংখ্যাটি কেবল শুরু মাত্র। বিশেষজ্ঞরা একে মূল হিমশৈলের চূড়া হিসেবে দেখছেন। এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা মূলত দুটি জায়গায় রয়েছে।

প্রথমত, ঋণের গড় আকার বাড়াতে হবে। এটি ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ বা ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। এতে গ্রাহকরা আরও বড় ধরনের উৎপাদনশীল কাজ করতে পারবেন। 

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের ডিজিটাল ঋণ। দেশের লাখ লাখ ফার্মেসি বা মুদি দোকানদার নিয়মিত এমএফএস ব্যবহার করেন। তারা ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও মার্চেন্ট পেমেন্ট করেন। ব্যাংকগুলো যদি এই লেনদেনের ইতিহাস দেখে সরাসরি ঋণ দেয়, তবে বড় পরিবর্তন আসবে। তারা সরাসরি ওষুধ কোম্পানি বা পাইকারি সরবরাহকারীকে অর্থ দিতে পারবে। এটি চলতি মূলধন হিসেবে কাজ করবে। আমরা প্রায়শই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি নিয়ে আলোচনা করি। এসএমই খাতের জন্য ডিজিটাল ঋণদানকে সঠিকভাবে কাঠামোগত রূপ দিতে হবে। এটিই হবে আগামী দিনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।

ডিজিটাল ন্যানো লোনের এই সাফল্য যেমন : আশাব্যঞ্জক, তেমনি এর টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রান্তিক গ্রাহকদের মধ্যে ডিজিটাল ঋণ ব্যবহারের নিয়ম ও ক্রেডিট স্কোরের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে কেউ অতিরিক্ত ঋণের ফাঁদে না পড়েন।

বাংলাদেশ ব্যাংককে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ন্যানো লোনের জন্য আরও নমনীয় ও যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে অন্যান্য ব্যাংকও এই মডেল অনুসরণে উৎসাহিত হয়। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ কোটি মানুষের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের সুরক্ষার ওপরই এই ব্যবস্থার আস্থা টিকে আছে।

ডিজিটাল ন্যানো লোন কেবল একটি ঋণ দেওয়ার মাধ্যম নয়, এটি ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের এই ১০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক প্রমাণ করেছে যে, দেশের সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করা যায় এবং সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসা সম্ভব। আগামী দিনের স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি রচিত হবে এই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের হাত ধরেই।

লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা