কাজী জিয়া উদ্দীন
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
কাজী জিয়া উদ্দীন। ফাইল ছবি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে শান্তি ও নিরাপত্তা কখনোই কেবল সদিচ্ছার ফল ছিল না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আন্তর্জাতিক আইন—এসব শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রস্তুতি ও সক্ষমতার বিকল্প হয়ে ওঠেনি।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিরাপত্তা-দর্শন পুনর্বিবেচনা করতে হয়েছে।
আজকের বিশ্বও তেমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, সাইবার নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ভঙ্গুরতা—সব মিলিয়ে নিরাপত্তার ধারণা আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবনাও নতুন বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
প্রাচীন চীনা সামরিক চিন্তাবিদ সান জু লিখেছিলেন, “যুদ্ধ না করেই প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করতে পারাই যুদ্ধকলার সর্বোচ্চ সাফল্য।”
এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং এমন সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে যুদ্ধের প্রয়োজনই না পড়ে।
একই ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। তার মতে, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকাই শান্তি রক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায়।
এই ধারণার বাস্তব উদাহরণ আজকের জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি শান্তিবাদকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থান দেয়। সংবিধানের নবম অনুচ্ছেদের মাধ্যমে যুদ্ধকে কার্যত পরিত্যাগ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় সেই নীতিই জাপানের সাফল্যের ভিত্তি ছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিবেশ বদলেছে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি, পূর্ব চীন সাগরে উত্তেজনা, চীনের সামরিক সক্ষমতার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধ—এসব কারণে জাপান এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, দূরপাল্লার প্রতিরোধক্ষমতা এবং নতুন নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সেই পরিবর্তনের অংশ। জাপানের এই নীতিগত পরিবর্তন যুদ্ধমুখিতা নয়; বরং প্রতিরোধক্ষমতার মাধ্যমে শান্তি রক্ষার কৌশল।
একই প্রবণতা ইউরোপেও দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ইউরোপে ধারণা ছিল, বৃহৎ আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধের যুগ শেষ হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জার্মানি প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পোল্যান্ড দ্রুত সামরিক আধুনিকীকরণ করছে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনও তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করেছে।
ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সীমিত জনসংখ্যা ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে রাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ধরে রেখেছে। সেখানে নিরাপত্তা শুধু সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব নয়; বেসামরিক প্রশাসন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং নাগরিক সমাজও এই প্রস্তুতির অংশ।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে, ভৌগোলিক আকার কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতার একমাত্র নির্ধারক নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে।
লি কুয়ান ইউয়ের একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য ছিল, দুর্বল অবস্থায় থাকলেও কোনো রাষ্ট্রের দুর্বলতার বার্তা দেওয়া উচিত নয়। এর মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার একটি মৌলিক দর্শন নিহিত রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হুমকির মধ্যেও দেশটি শিল্পায়ন, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়েছে।
এতে স্পষ্ট হয়, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যও নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সরবরাহব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। ফলে নিরাপত্তা এখন কেবল সীমান্ত রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, জ্বালানি, সমুদ্রপথ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি আগামী দশকগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, নীল অর্থনীতি, সমুদ্রপথে বাণিজ্য, জ্বালানি অনুসন্ধান এবং সাবমেরিন যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পরিবেশও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় ভবিষ্যতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম বাস্তবতা হলো, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা অনেক সময় সংঘাতের সম্ভাবনাই কমিয়ে দেয়।
সে কারণেই বিশ্বের বহু দেশ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা কূটনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা গবেষণা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য কোনো প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি একবার বলেছিলেন, “শান্তি অসম্ভব নয়, যেমন যুদ্ধও অনিবার্য নয়।”
এই উপলব্ধিই সম্ভবত বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শান্তিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের নীতিগত লক্ষ্য। তবে সেই শান্তিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচক্ষণ কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা।
স্বাধীনতা অর্জন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ায় শান্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি কেবল সদিচ্ছা নয়; প্রস্তুতি, সক্ষমতা এবং দূরদর্শিতাও।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি