ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রহিয়াছে- ‘শেষ ভালো যাহার, সব ভালো তাহার’। কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক বাস্তবতায় ইহার একটি নব সংস্করণ প্রচলিত হইতে পারে- ‘শেষে পদোন্নতি যাহার, তাহার অতীতের হিসাব আর কাহার?’ কারণ, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ, কর্মদক্ষতা কিংবা শৃঙ্খলা-এই সকল শব্দ যেন ক্রমশ অভিধানের অলংকারে পরিণত হইতেছে; বাস্তবের প্রশাসনে তাহাদের স্থান দখল করিয়াছে এক রহস্যময় পরশপাথর, যাহার স্পর্শে অবসরও নবজীবন লাভ করে, চাকুরিচ্যুতিও পদোন্নতির সিঁড়ি হইয়া উঠে।
গত ৯ জুলাই সরকার যে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করিয়াছে, তাহা পাঠ করিলে সাধারণ মানুষের বিস্মিত হইবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে। কারণ, সেখানে এমন কর্মকর্তাও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করিয়াছেন, যিনি ইতোমধ্যে অবসরে গিয়াছেন। আবার এমন ব্যক্তিও সৌভাগ্যের শিখরে আরোহণ করিয়াছেন, যাহাকে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চাকুরিচ্যুত করা হইয়াছিল। ইহা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নহে; ইহা যেন ভাগ্যের এক অভিনব কাব্য, যেখানে অতীতের সকল অধ্যায় মুছিয়া দিয়া শেষ পাতায় শুধু একটি শব্দ লিখিত থাকে- ‘পদোন্নতি’।
অবশ্য, প্রশাসনের ইতিহাসে বিচিত্র ঘটনা নতুন নহে। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে পদোন্নতি প্রদান এবং চাকুরিচ্যুত ব্যক্তিকেও একই কাতারে স্থান দেওয়া- ইহা নিঃসন্দেহে অভিনবত্বের দাবিদার। এখন প্রশ্ন উঠিতে পারে, তবে কি অবসর আর চাকুরিচ্যুতি- উভয়ই কেবল সাময়িক বিরতি? পদোন্নতির মহোৎসব উপস্থিত হইলেই কি সকল অতীত অপরাধ, ব্যর্থতা ও দায়বদ্ধতা এক নিমিষে ধৌত হইয়া যায়?
প্রশাসনের একেবারে নিম্নস্তরের কোনো কর্মচারী সামান্য অনিয়ম করিলেও তাহার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সময় লাগে না। অনেক সময় ক্ষুদ্র ত্রুটিও তাহার কর্মজীবনের পথ রুদ্ধ করিয়া দেয়। অথচ উচ্চপদে আসিলে যেন নিয়মের ভাষাও পরিবর্তিত হয়। সেখানে দায়িত্বে অবহেলা, শাস্তি কিংবা অপসারণ-কোনোটিই শেষ কথা নহে। শেষ কথা হইল-কোনো একদিন হয়তো একটি প্রজ্ঞাপনে আপনার নামও থাকিবে।
ইহা এমন এক আশাবাদের শিক্ষা, যাহা প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ একাডেমিতেও সম্ভবত পড়ানো হয় না। নতুন কর্মকর্তারা এখন নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিবেন, কর্মদক্ষতার চেয়ে ধৈর্য অধিক মূল্যবান। কারণ, কর্মজীবনে যাহাই ঘটুক, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাহত হইবার কারণ নাই। অবসর? সমস্যা নহে। চাকুরিচ্যুতি? তাহাও হয়তো সাময়িক। পদোন্নতির দেবতা কাহার প্রতি কখন প্রসন্ন হইবেন, তাহা কেহ জানে না।
অবশ্য পদোন্নতির দায়িত্বে যাহারা রহিয়াছেন, তাহাদের প্রতি কৃতজ্ঞ না হইয়া উপায় কী? এমন দয়ার দৃষ্টান্ত প্রশাসনের ইতিহাসে বিরল। তাহারা অতীতের কাঁটা দেখেন না; কেবল সম্ভাবনার ফুল দেখেন। যাহারা আর চাকরিতেই নাই, তাহাদেরও তাহারা স্মরণ রাখেন। যাহারা একদা অপসারিত, তাহাদের প্রতিও তাহাদের হৃদয় উন্মুক্ত। এমন উদারতা সত্যিই প্রশংসনীয়- যদি না ইহার ফল প্রশাসনিক ন্যায়বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করিত।
সমস্যা পদোন্নতি প্রদান নহে; সমস্যা হইল পদোন্নতির মানদণ্ড। রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ক্ষেত্র নহে। ইহা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। যদি দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি শেষ পর্যন্ত পদোন্নতিতে পর্যবসিত হয়, তবে দায়িত্বশীলতার শিক্ষা কোথায়? যদি অবসরের পরও পদোন্নতি অনিবার্য হয়, তবে কর্মরত কর্মকর্তাদের কর্মমূল্যায়নের অর্থ কী?
প্রশাসনের শক্তি তাহার বিশ্বাসযোগ্যতায়। একজন সৎ, পরিশ্রমী ও নীরব কর্মকর্তা বহু বছর নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ সৌভাগ্যের ছোঁয়া না থাকায় কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি লাভ করিলেন না। অপরদিকে, অন্য কেহ নানা বিতর্ক, শাস্তি কিংবা অপসারণের ইতিহাস লইয়াও পদোন্নতির মাল্য পরিধান করিলেন। ইহা শুধু ব্যক্তিগত বেদনার বিষয় নহে; ইহা সমগ্র প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্য এক নীরব সংকেত- যোগ্যতা সর্বদা যথেষ্ট নহে।
জনগণ প্রশাসনের অন্তর্গত জটিল নথিপত্র বোঝেন না, বোঝেন ফলাফল। তাহারা দেখেন, যাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছিল, তিনিই আবার পুরস্কৃত হইলেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-তবে কি শাস্তি কেবল আনুষ্ঠানিকতা? দায়বদ্ধতা কি কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ভাষা?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের মর্যাদা রক্ষা করা সরকারেরই দায়িত্ব। পদোন্নতি কোনো করুণা নহে; ইহা রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে কর্মদক্ষতা, সততা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি যদি বিতর্কে আচ্ছন্ন হয়, তবে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।
শেষে একটি বিনীত প্রস্তাব রাখা যাইতে পারে। যদি সত্যই এমন উদারতার যুগ আরম্ভ হইয়া থাকে, তবে হয়তো ভবিষ্যতে “চাকুরিচ্যুত কর্মকর্তা কল্যাণ পদক”, “অবসরোত্তর অগ্রগতি সম্মাননা” কিংবা “দায়িত্বে অবহেলা সত্ত্বেও উন্নয়ন পদক” প্রবর্তনের কথাও বিবেচনা করা যাইতে পারে। তাহাতে অন্তত রম্যরসের অভাব থাকিবে না।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা রম্যরসের বিষয় নহে। প্রশাসনের ভিত্তি দাঁড়াইয়া থাকে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির উপর। পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন যদি সেই ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, তবে হাসির আড়ালেও উদ্বেগ লুকাইয়া থাকে। কারণ, প্রশাসনে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত দেয় রাষ্ট্র, আর সেই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ