× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্থানীয় সরকারকে দুর্বল রেখে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়া যায় না

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ১৭ ঘণ্টা আগে

রাসেল আহমদ। ফাইল ছবি

রাসেল আহমদ। ফাইল ছবি

আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বড় বৈপরীত্য হলো, যে স্থানীয় সরকারকে সংবিধান জনগণের নিকটতম শাসনব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, বাস্তবে সেই স্থানীয় সরকারই সবচেয়ে সীমিত ক্ষমতার দূর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। জনগণের হাতের নাগালে থাকা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর উন্নয়ন, জনসেবা এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ এবং প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এমন এক বাস্তবতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে জবাবদিহি আছে, কিন্তু কর্তৃত্ব নেই; দায়িত্ব আছে, কিন্তু কার্যকর ক্ষমতা নেই।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এ প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখপাত্র। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্থানীয় অবকাঠামো, সালিশ-নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে অসংখ্য সেবার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই ইউনিয়ন পরিষদ শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান সুস্পষ্ট। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, কর আরোপ, বাজেট প্রণয়ন এবং স্থানীয় তহবিল ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান স্থানীয় সরকারকে কেবল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ের কার্যকর 'সরকার' হিসেবেই কল্পনা করেছে। 

কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ক্ষমতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকাংশ কর্তৃত্ব এখনও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে ইউনিয়ন পরিষদকে বহু দায়িত্ব পালন করতে হলেও সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তাদের হাতে নেই।

দুই মেয়াদে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি এই বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কাগজে-কলমে ইউনিয়ন পরিষদকে ১০টি বাধ্যতামূলক ও ৩৯টি ঐচ্ছিক দায়িত্বসহ শতাধিক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন, নারী ও শিশু সুরক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন- সবই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ প্রদান, ভিজিএফ-ভিজিডি কর্মসূচি, কিছু ক্ষুদ্র অবকাঠামো নির্মাণ এবং সালিস-নিষ্পত্তির মধ্যে।

এই সীমাবদ্ধতার কারণ দায়িত্বের অভাব নয়; বরং দায়িত্ব পালনের বাস্তব সুযোগের অভাব। ইউনিয়ন পরিষদের ওপর অনেক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আর্থিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি।

বিশ্বব্যাপী কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থার চারটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ (Function), কর্মী (Functionary), অর্থ বা সম্পদ (Fund) এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে (Freedom) গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলো এই চারটি ভিত্তির কোনোটিই পূর্ণমাত্রায় ভোগ করে না।

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীও ইউনিয়ন পরিষদের অধীন নন। তাঁরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হন। ফলে চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হলেও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর তাঁদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, সমাজসেবা কিংবা নারী ও শিশু উন্নয়ন- প্রায় সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। সংবিধানে ইউনিয়ন পরিষদকে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এটি অনুমোদননির্ভর প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রায়শই নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখতে বাধ্য হন।

এই কাঠামো শুধু স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করেনি; অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরও নৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটে ফেলেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে দায়িত্ব ও প্রত্যাশা জনপ্রতিনিধির ওপর বর্তায়, কিন্তু প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে অন্য কারও হাতে।

একজন চেয়ারম্যান যখন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা স্থানীয় সেবার জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন, অথচ সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তখন একটি অস্বাভাবিক প্রশাসনিক বাস্তবতা তৈরি হয়। এর ফলে ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত দুর্বলতাই অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষতা, অনিয়ম এবং হতাশার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

তাই স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সমস্যাকে কেবল ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা বা জনপ্রতিনিধির সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। যখন দায়িত্ব, জবাবদিহি এবং জনআকাঙ্ক্ষা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে, কিন্তু সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অন্যত্র অবস্থান করে, তখন পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়; এটি গণতন্ত্রের গভীরতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশ্বের বহু দেশ দেখিয়েছে যে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপাদান। কারণ স্থানীয় মানুষের সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় এবং দ্রুত সমাধানও করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে স্থানীয় সরকারকে নতুনভাবে ভাবার। ইউনিয়ন পরিষদকে কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল, অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের চেতনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো রাষ্ট্রের সেবা কতটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

কারণ জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকলে রাষ্ট্রের ভিত্তিও দুর্বল থাকে। ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং ক্ষমতার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্কার। স্থানীয় সরকারকে দুর্বল রেখে উন্নয়ন সম্ভব হতে পারে, কিন্তু টেকসই গণতন্ত্র ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও জনপ্রতিনিধি

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা