সম্পাদকের লেখা
মারুফ কামাল খান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কাব্যগ্রন্থের নাম ‘সোনার তরী’। কবিতার নাম ‘বর্ষাযাপন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই কবিতায় দুর্দান্ত কিছু চরণ রচনা করেছেন। সেই কয়েক ছত্রকে ছোটগল্পের সেরা সংজ্ঞা বলে ভাবা হয়। রবিঠাকুর লিখেছেন :
ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা,
ছোটো ছোটো দুঃখকথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা
ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে
সাঙ্গ করি’ মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত
অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা,
অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল--
সংসারের দশ দিশি
ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝরঝর বরষার মতো--
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি
পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই সব হেলাফেলা
নিমেষের লীলাখেলা
চারিদিকে করি স্তূপাকার,
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি
একটি বিস্মৃতিবৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণনিশার।
আমি মাঝেমধ্যে চোখ বুঁজে মনে মনে এই অসাধারণ পঙ্ক্তিমালা জপ করি। তখন আমার নিমগ্ন চৈতন্যে অবিরল ঝরতে থাকে রিমঝিম বৃষ্টি। ভাবনার অথৈ গহিনে ডুবে গিয়ে আমি আমাকে, আমার জীবনকে একটি ছোটগল্পের মতো করে দেখি। আমি ভাবি আমার সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র সবকিছুই হোক একেকটি ছোটগল্প কিংবা অজস্র ছোটগল্পের সমাহার।
বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনার যে গুরুভার, তা যদি একটি মেদহীন, আঁটসাঁট ও সুনিপুণ ছোটগল্পের অবয়ব পেত, তবে এই ভূখণ্ডের চেয়ে সুখনীড় আর বুঝি কোথাও হতো না।
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমার চিত্তপটে বারবার ভেসে ওঠে একটি আকাঙ্ক্ষাÑ আমি চাই এ দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারটি হোক ঠিক রবীন্দ্রনাথের সেই ছোটগল্পের মতো। স্মার্ট, বাহুল্যবর্জিত এবং পরম ভারসাম্যপূর্ণ। যার কোনো অঙ্গে মেদ থাকবে না, থাকবে না কোনো অযথা বাগাড়ম্বর কিংবা দীর্ঘ সুড়ঙ্গের মতো অন্তহীন প্রতিশ্রুতির বহর।
আমার এই চাওয়া কোনো দূরবর্তী অলীক কল্পনা নয়, বরং একান্তই অন্তর্গত ও আত্মিক টান থেকে উৎসারিত। তারেক রহমানের মায়ের সঙ্গে কাজ করার দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাকে নিজের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা ও সম্মান করেছি। সেই সুবাদে তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী ও দলের শীর্ষনেতা হওয়া সত্ত্বেও তাকে আমি আমার অনুজের মতো মনে করি। একজন অগ্রজের স্থান থেকে আমি তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি। আর সেই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে একটি ‘স্মার্ট’ ও সংক্ষিপ্ত টিমে। আমি চাই, তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুতে বসাবেন এক-একজন যোগ্য, কুশলী ও আধুনিক মনস্ক মানুষকে। তার পুরো টিমটি অতিকায় শ্বেতহস্তী হবে না, বরং হবে চিতাবাঘের মতো চটপটে ও ক্ষিপ্র।
‘নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা, নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ...’ রবিঠাকুরের এই চরণের মতোই আমি চাই না এই সরকারের কোনো মস্ত বড়, আকাশকুসুম পরিকল্পনা থাকুক। সুদীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষের বর্তমানকে আমি আর বন্দি দেখতে চাই না। বরং সরকার সাজাক ছোট ছোট, নিখুঁত ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা। মানুষের প্রতিদিনের চাহিদা, সমস্যা, ক্ষুধা ও নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াই তো বড় বড় তত্ত্বকথা দিয়ে নিরসন করা যায় না। সাধারণ মানুষের গরিবি আর বেকারি ঘোচাতে ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ডের মতো একদম মাটির কাছাকাছি নেওয়া ছোট ছোট উদ্যোগ দেবে অনেক বেশি সুফল। রাষ্ট্র বড় বড় অনুদান দিয়ে মানুষকে অলস না করুক, বরং অল্প কিন্তু নিয়মিত সাহায্যে প্রতিটি পরিবারের চাকা সচল রাখুক।
আমি চাই ছোটগল্পের মতো আমার প্রিয় সরকারটির ছোঁয়ায় বাংলার প্রতিটি উঠোন, প্রতিটি প্রান্তর হয়ে উঠুক একেকটি প্রাণবন্ত উর্বর খামার। চারদিকে ডালপালা মেলুক সবুজ গাছপালা; নদী-নালা আর পুকুর ভরে উঠুক রুপালি মাছে। গোয়াল ভরা গরু-ছাগল, খামার ভরা হাঁস-মুরগি আর ঘরে ঘরে ডিম-দুধ-মাংসের প্রাচুর্য আসুক। ফলমূল আর সোনালি শস্যের ফলনে ভরে উঠুক দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি। এভাবেই যখন দেশের নিজস্ব সম্পদ বাড়বে, তখনই মানুষের ললাট থেকে মুছে যাবে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। ঘরে ঘরে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আর সহজ সুখ। এ দেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলো তো আকাশচুম্বী নয়; সামান্য ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা, সন্তানের শিক্ষা, রোগব্যাধিতে সাধ্যমতো চিকিৎসা-পরিচর্যা, আর একটুখানি নিরাপদে ঘুমানোর সুযোগÑ এই ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই যেন এই সরকারের হাত ধরে পরম মমতায় পূরণ হয়।
একটি আদর্শ ছোটগল্পের সবচেয়ে বড় সার্থকতা কোথায়? যখন গল্পটি শেষ হয়েও শেষ হয় না। পাঠকের মনে এক অদ্ভুত রোমন্থন আর মিষ্টি অতৃপ্তি রেখে যায়। আমি স্বপ্ন দেখি, তারেক রহমানের এই সরকারের মেয়াদ যখন ফুরাবে, তখন এ দেশের মানুষ যেন কোনো এক গোধূলি লগ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেÑ ‘এত জলদি সময় কেটে গেল? আর একটুখানি সময় যদি পাওয়া যেত, তবে বড় ভালো হতো!’
শাসনের মহাকাব্যে ক্ষমতার দম্ভ থাকে, দীর্ঘায়ুর একঘেঁয়েমি থাকে। কিন্তু ছোটগল্পের আয়ু অল্প হলেও তার আবেদন থাকে চিরন্তন। আমার অনুজপ্রতিম রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের কাছে একজন অগ্রজের এটুকুই আকুতিÑ তিনি যেন মহাকাব্যের দীর্ঘ ক্লান্তিকর অধ্যায় না হয়ে, বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রাবণ শেষের এক টুকরো স্নিগ্ধ, অতৃপ্তিময় ও সুন্দর ‘ছোটগল্প’ হয়ে ওঠেন। যার রেশ এ দেশের মানুষ আজীবন হৃদয়ে বয়ে বেড়াবে।
আমার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া নেই। আমার প্রত্যাশা সামষ্টিকÑ দেশ, জাতি ও বৃহত্তর জনসমাজের জন্য। আমি চাই একটি স্বস্তিকর বর্তমান এবং একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ। তারেক রহমানের ছোটগল্পের সরকার যেন সেই ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকে দিতে পারে।