× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক্সপ্লেইনার

নতুন ৪% স্প্রেড নীতি কি এসএমই খাতে সংকট আরও বাড়াবে?

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

আহমেদ তোফায়েল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আহমেদ তোফায়েল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অর্থনীতির মূল শক্তি হলো ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প। একে আমরা সংক্ষেপে এসএমই খাত বলি। বাংলাদেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে এই খাতের অবদান অনেক। 

দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিংহভাগ মানুষের আয়ের উৎস এ খাত, কিন্তু খাতটি দীর্ঘদিন ধরে বড় সংকটে ভুগছে। সংকটটি হলো প্রয়োজনীয় ঋণের অভাব। এখনও দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পান না।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এক নিয়ম চালু করেছে। এ নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের সুদের গড় ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হবে। ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণকে এ নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে, কিন্তু এসএমই খাতকে এর আওতায় আনা হয়েছে। ব্যবসার খরচ কমানোর জন্য নেওয়া হয়েছে এ সিদ্ধান্ত। এতে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী সমান হারে ঋণ পাবেন। 

আপাতদৃষ্টে এটি ভালো উদ্যোগ, তবে এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিকও আছে। এর ফলে ব্যাংক খাতে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন নিয়ম ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের পথ আরও বন্ধ করে দেবে কি না।

ব্যাংকিং ব্যবসার নিয়ম খুব সহজ। ব্যাংকগুলো কম সুদে মানুষের কাছ থেকে টাকা জমা রাখে। এরপর সেই টাকা কিছুটা বেশি সুদে ঋণ হিসেবে দেয়। এ দুই সুদের মাঝখানের ব্যবধানকে স্প্রেড বলে। 

এ স্প্রেডের টাকা দিয়ে ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটায়। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের ক্ষতি পূরণ করে। সবশেষে ব্যাংকের মুনাফা নিশ্চিত হয়।

গত এপ্রিল মাসের তথ্য দেখা যাক। তখন ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদ ছিল ৬.২৪ শতাংশ। আর ঋণের গড় সুদ ছিল ১১.৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ, তখন সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড ছিল ৫.৭২ শতাংশ। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এ ব্যবধান আরও বেশি ছিল। এখন নতুন নিয়মে এই ব্যবধান ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এর অর্থ হলো ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদের হার অনেক কমিয়ে আনতে হবে। 

কয়েকটি বড় বেসরকারি ব্যাংক আগে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছিল। এখন তাদের সুদের হার অনেক কমাতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হলেও ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে তা কঠিন হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভিন্ন। একটি বড় কোম্পানিকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া সহজ। এতে ব্যাংকের সময় ও লোকবল কম লাগে, কিন্তু ১০০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ১ কোটি টাকা করে ঋণ দেওয়া অনেক কঠিন। এতে ব্যাংকের খরচ ও পরিশ্রম অনেক গুণ বেড়ে যায়। ব্যাংকাররা একে উচ্চ পরিচালন ব্যয় বলেন।

যেমন: ব্র্যাক ব্যাংকের সাধারণ খরচ ৪৫ শতাংশ, কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণ খাতের ক্ষেত্রে এ খরচ ৬৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র ঋণের জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের সরাসরি উদ্যোক্তার দোকানে বা কারখানায় যেতে হয়। ব্যবসার অবস্থা সরজমিনে দেখতে হয়। তাই নিয়মিত তদারকি করতে হয়। 

এ বাড়তি খরচের কারণে এসএমই ঋণের সুদের হার কিছুটা বেশি হয়। এখন সুদের ব্যবধান ৪ শতাংশে বেঁধে দিলে ব্যাংকের এই খরচ উঠবে না। ফলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র খাতে নতুন ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিতে পারে। তারা বড় বড় করপোরেট ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

অর্থনীতির একটি সাধারণ নিয়ম আছে। কোনো পণ্যের দাম জোর করে কমিয়ে দিলে বাজারে তার জোগান কমে যায়। ঋণের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূল সমস্যা সুদের হার নয়। তাদের মূল সমস্যা হলো সময়মতো ঋণ না পাওয়া। মাঠপর্যায়ের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, ছোট উদ্যোক্তারা ১৫ শতাংশ সুদেও ঋণ নিতে রাজি থাকেন। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে তাদের মহাজনদের কাছে যেতে হয়। মহাজনরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ সুদ নেয়।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লাভের হার সাধারণত বেশি থাকে। তাই তারা কিছুটা বেশি সুদেও ঋণ শোধ করতে পারেন, কিন্তু নতুন নিয়মের কারণে ব্যাংক ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্দেশ্য ছিল সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা, কিন্তু এর বাস্তব ফল উল্টো হতে পারে। কম সুদের সুবিধা কেবল বড় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাই পেয়ে যেতে পারেন। আর প্রান্তিক উদ্যোক্তারা বাজার থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।

দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা এখন খুব একটা ভালো নয়। সরকারি ও ইসলামী ধারার অনেক ব্যাংক সংকটে রয়েছে। তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভালো মানের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকই এখন এসএমই খাতের মূল ভরসা। ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৭ শতাংশ এ খাতে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। বর্তমানে এটি প্রায় ১৮ শতাংশ।

যখন ব্যাংকগুলোকে এ খাতে ঋণ বাড়াতে উৎসাহিত করা দরকার, তখন এ নিয়ম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো আলোচনা বা গবেষণা ছাড়া হঠাৎ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো চাপে পড়ে গেছে। 

ব্যাংক মূলত নিজস্ব কমিটির মাধ্যমে সুদের হার ঠিক করে। এক আদেশে সেই নিয়ম বদলে দিলে ব্যাংকের মুনাফায় বড় আঘাত আসবে। এর একটি নেতিবাচক প্রভাব দেশের শেয়ার বাজারেও পড়তে পারে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে সুদের হার কমানোর একটি চাপ রয়েছে। বাজারে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। উৎপাদন খরচ না কমলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। এ দিক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাস্তবতার বিচার করা জরুরি। 

ক্রেডিট কার্ডে যদি ছাড় দেওয়া যায়, তবে ক্ষুদ্র শিল্পে কেন নয়? ক্ষুদ্র শিল্প তো দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যদি ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে ঋণ কমিয়ে দেয়, তবে পুরো অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি বন্ধ হয়ে যাবে। 

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটে ক্ষুদ্র ঋণ অনেক নিরাপদ। কারণ এ খাতের ব্যবসায়ীরা বড় বড় ব্যবসায়ীদের মতো ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হন না। তারা কষ্ট করে হলেও ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন।


সমাধানের উপায়

বর্তমান সংকট কাটিয়ে ক্ষুদ্র খাতের ঋণ সচল রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে এ ৪ শতাংশ স্প্রেডের নিয়ম থেকে সাময়িকভাবে বাইরে রাখা উচিত। এ খাতের জন্য সুদের ব্যবধান ৫ থেকে ৫.৫ শতাংশ পর্যন্ত করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

ক্ষুদ্র ঋণের খরচ কমানোর জন্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। মোবাইল অ্যাপ বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দিলে ব্যাংকের খরচ কমবে। তখন কম সুদেও ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি কম সুদে ব্যাংকগুলোকে তহবিল দেয়, তবে ব্যাংকের খরচ কমবে। এতে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কম সুদে ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানত দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম বা ঋণ নিশ্চয়তা ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি কমবে।

ব্যাংকিং খাতের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। বাস্তবসম্মত নীতিই কেবল বাজারে সুশাসন আনতে পারে।

সুদহার নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত। ৪ শতাংশ স্প্রেড নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বড় ব্যবসার জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু ক্ষুদ্র খাতের ওপর এর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। 

আমরা যদি দেশের কোটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের বাইরে ঠেলে দিই, তবে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। আশা করা যায় বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মটি কিছুটা শিথিল করবে। এতে ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উভয়ই রক্ষা পাবে।


আহমেদ তোফায়েল

লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা