কাজী জিয়া উদ্দীন। ফাইল ছবি
বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি সম্মেলন, একটি যুদ্ধ কিংবা একটি কূটনৈতিক ঘটনার মধ্যেই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো মিলেই একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আর্কটিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির প্রতিযোগিতা এবং তুরস্কে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ন্যাটো সম্মেলনের আলোচনাগুলো সেই পরিবর্তনেরই অংশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অনেক বিশ্লেষক এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে একটি ধারণা ব্যবহার করছেন ‘ন্যাটো ৩.০’। এটি ন্যাটোর কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি বা ঘোষিত কৌশল নয়, বরং একটি বিশ্লেষণধর্মী ধারণা।
এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, ন্যাটো ধীরে ধীরে ঐতিহ্যগত সামরিক জোটের গণ্ডি অতিক্রম করে এমন এক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, জ্বালানি, তথ্য এবং সরবরাহব্যবস্থাও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ন্যাটোর প্রথম পর্যায় ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিরোধ করার সামরিক জোট। দ্বিতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, আফগানিস্তান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকট। বর্তমান পর্যায়ে নিরাপত্তার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন যুদ্ধক্ষেত্র কেবল স্থল, নৌ ও আকাশে সীমাবদ্ধ নয়; সাইবার জগৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ, অর্ধপরিবাহী চিপ প্রযুক্তি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উপাত্ত অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং কৌশলগত সংযোগ আজ আন্তর্জাতিক শক্তির নতুন পরিমাপক।
বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও নীতিবিষয়ক সাময়িকীগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দ্য ইকোনমিস্ট বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থানের কথা বলছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস দেখাচ্ছে, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা এখন আর আলাদা বিষয় নয়; বরং একই কৌশলগত সমীকরণের অংশ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতাকে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সরবরাহ শৃঙ্খল ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে নতুন ভূরাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে রয়টার্স, ফরেন অ্যাফেয়ার্স এবং ফরেন পলিসি ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ব্যয়, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতাকে আগামী দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে।
এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বসফরাস ও দারদানেলস প্রণালী আজও ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগের প্রধান জলপথ। সাম্প্রতিক সম্মেলনে তুরস্ককে ঘিরে সম্পর্কের নতুন মাত্রা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতি জোরদারের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করে।
ইউক্রেন যুদ্ধও এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অনেকের ধারণা ছিল, বৃহৎ শক্তির সামরিক প্রতিযোগিতার যুগ শেষ হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধটি দেখিয়েছে, ভূগোল, সামরিক সক্ষমতা এবং জোটভিত্তিক নিরাপত্তা এখনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় উপাদান। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপের অধিকাংশ দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সমষ্টিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তানীতিও এ আলোচনার বাইরে নয়। তার নীতির সমালোচনা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছেন। এর ফলে এমন একটি ন্যাটো কাঠামোর আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু নিরাপত্তার দায়ভার আরও বেশি ভাগাভাগি হবে।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে যেকোনো উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ইউরোপ, এশিয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিও তার প্রভাব অনুভব করে। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই বাস্তবতা নতুন নয়। মার্কিন নৌ-কৌশলবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান এক শতাব্দীরও বেশি আগে বলেছিলেন, যে রাষ্ট্র সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করবে, সে-ই বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে এগিয়ে থাকবে। আজ লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল, হরমুজ প্রণালী, মালাক্কা প্রণালী, আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব তার সেই তত্ত্বকেই নতুন বাস্তবতায় তুলে ধরছে।
একইভাবে মার্কিন কৌশলবিদ জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি তার দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড গ্রন্থে ইউরেশিয়াকে বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় ইউক্রেন, ককেশাস, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া, ভারত মহাসাগর এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা তাঁর বিশ্লেষণকে নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও তার তত্ত্ব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে, তথাপি তথ্যযুদ্ধ, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, সামাজিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল প্রভাব বিস্তারের বর্তমান বাস্তবতা তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
অন্যদিকে আর্কটিক অঞ্চল দ্রুত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং উত্তর আটলান্টিকের কৌশলগত গুরুত্ব ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলও একইভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিনের শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে জাপান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করছে। চীনের উত্থান, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ফলে ইউরোপীয় নিরাপত্তা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ক্রমেই পরস্পরনির্ভর হয়ে উঠছে।
এদিকে বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক দক্ষিণ নামে পরিচিত দেশগুলোর জনসংখ্যা, শ্রমশক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর আজ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোহিত সাগর, হরমুজ, ভারত মহাসাগর, আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরকে যুক্ত করা সামুদ্রিক করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস নতুন শিল্প, বিনিয়োগ এবং উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে সাবমেরিন কেবল, উপাত্তকেন্দ্র, উপগ্রহ যোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ভবিষ্যতের কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে নীল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, জলবায়ু কূটনীতি এবং উন্নয়ন সহযোগিতায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী সামুদ্রিক কৌশল গ্রহণ, নীল অর্থনীতির বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ, গভীর সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, ভারসাম্যপূর্ণ বহুমাত্রিক কূটনীতি অনুসরণ, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এবং ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংযোগব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ-এসব বিষয় আগামী দিনের জাতীয় অগ্রাধিকারে থাকা উচিত।
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তা এখন আর শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্রের প্রশ্ন নয়। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সমুদ্রপথ, তথ্য, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কৌশলগত সংযোগ-সব মিলিয়ে গড়ে উঠছে নতুন বৈশ্বিক নিরাপত্তা স্থাপত্য।
আঙ্কারা, ইউক্রেন, হরমুজ, আর্কটিক, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক দক্ষিণ-এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার পরস্পর-সংযুক্ত অধ্যায়। ‘ন্যাটো ৩.০’ সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা।
বাংলাদেশের জন্য তাই এটি শুধু পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়; বরং নিজের কৌশলগত অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় গুরুত্ব নির্ধারিত হবে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়; বরং ভূগোল, প্রযুক্তি, জ্ঞান, সমুদ্র, সংযোগ এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতির সমন্বয়ে।
ইতিহাসের প্রতিটি রূপান্তর কিছু দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। বাংলাদেশের সামনেও তেমন একটি সুযোগ উপস্থিত। প্রশ্ন একটাই-আমরা কি কেবল পরিবর্তনের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ কূটনীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থার একজন কার্যকর অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব?
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি