এক্সপ্লেইনার
আহমেদ তোফায়েল। ফাইল ফটো
জাতিসংঘের আঙ্কটাড প্রতিবেদন ২০২৬ আমাদের অর্থনীতির একটি বড় বৈপরীত্য উন্মোচন করেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। টাকার অঙ্কে তা ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। আপাতদৃষ্টে এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে হতাশার ছবিই দেখা যায়।
বাংলাদেশ এখন ৫০১ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অর্থনীতি। অথচ বিনিয়োগ আকর্ষণে আমরা আফ্রিকার উগান্ডা, ঘানা বা কঙ্গোর মতো দেশের চেয়েও পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশের তুলনায় উগান্ডা অর্থনীতির আকার সাত ভাগের এক ভাগ। কিন্তু দেশটি গত বছর ৩ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। এই সমীকরণ একটি বিষয় স্পষ্ট করে। কেবল জিডিপির আকার বড় হলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। এর জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ-অনুকূল পরিবেশ।
২০২৫ সালের এফডিআই প্রবাহে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে এই বৃদ্ধির পেছনে একটি বিশেষ কারণ আছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। সেই বছর বিদেশি বিনিয়োগ বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। ওই মন্দা বছরের তুলনায় পরের বছর বিনিয়োগ কিছুটা বাড়াটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু চিন্তার মূল কারণ বিনিয়োগের ধরনের মধ্যে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এই এফডিআই প্রবাহের বড় অংশই নতুন পুঁজি বা ‘গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট’ নয়। এটি আসলে ‘পুনর্বিনিয়োগ’।
ডলার সংকটের কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি মুনাফা দেশে নিতে পারছে না। আবার অনেকের স্থানীয় পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে তারা লভ্যাংশ এখানেই আবার খাটাচ্ছে। কিন্তু এতে নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থানও। আঙ্কটাড বলছে, বাংলাদেশে নতুন প্রকল্পের বিনিয়োগ ২০২৪ সালের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে।
আফ্রিকার শিক্ষা ও আমাদের ব্যর্থতা
আফ্রিকার ছোট দেশগুলো কীভাবে বড় বিনিয়োগ টানছে, তা দেখা দরকার। আঙ্কটাড বলছে, ঘানা, উগান্ডা ও কঙ্গো মূলত জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে বড় বিনিয়োগ পেয়েছে। এর পেছনে রয়েছে তাদের সাহসী নীতি সংস্কার। ঘানার প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিয়েই ব্যবসার খরচ কমাতে কর বাতিল করেছেন। উগান্ডা তাদের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষকে সত্যিকারের ‘ওয়ান স্টপ সেন্টারে’ রূপান্তর করেছে। কঙ্গো বিদ্যুৎ খাতের উদারীকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে।
আমাদের দেশেও সংস্কারের চেষ্টা হয়েছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিডা ও বেজার দায়িত্ব একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে দিয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসা পরিবেশ সূচক বা ক্লাইমেট ইনডেক্সে (বিবিএক্স) বলছে, আইন-কানুনের তথ্য, অবকাঠামো, শ্রম নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য সহজীকরণ এই সবকটি সূচকেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে ক্ষতটা আরও স্পষ্ট হয়। গত বছর ভারত ৩৯ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। এমনকি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ পাকিস্তানও আমাদের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা চান। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি নিয়ে তাদের মনে উদ্বেগ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ঘরে। গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটও কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় উদ্যোক্তারাই হাত গুটিয়ে রাখছেন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতিতে চলছেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী একটি ভালো পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারকে এফডিআই আকর্ষণের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে করের জালে না আটকে ব্যবসা সহজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
উত্তরণের পথ ও আমাদের করণীয়
বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি বড় লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তারা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে চায়। এই লক্ষ্য পূরণের প্রধান শর্ত হলো বিদেশি বিনিয়োগের বড় লাফ। বাংলাদেশকে যদি ভিয়েতনাম বা উগান্ডার মতো বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে হয়, তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। সনাতন চিন্তাভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে:
১. সরকারকে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আদায়ের চিন্তা বাদ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তির স্থানান্তরের ওপর জোর দিতে হবে। বিনিয়োগের প্রাথমিক বছরগুলোতে কর অবকাশ এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও উদার হতে হবে।
২. কাগজে-কলমে ওয়ান স্টপ সার্ভিস থাকলেও বাস্তবে কাজ হয় না। একটি লাইসেন্স পেতে বিনিয়োগকারীদের ডজনখানেক টেবিলে ঘুরতে হয়। ভিয়েতনামের মতো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেন তাদের অর্জিত মুনাফা সহজে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। এই নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে হবে। মুনাফা স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি জটিলতামুক্ত করতে হবে।
৪. বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শুধু জমি বরাদ্দ দিলেই হবে না। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে জ্বালানি খাতকে আরও উদারীকরণ করতে হবে। বেসরকারি ও বিদেশি অংশীদারত্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পণ্য খালাস পর্যন্ত সব স্তরে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক মানের সালিশি আদালত বা আইনি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখা দেশের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু সেই স্বপ্নকে ছুঁতে হলে আঙ্কটাডের এই প্রতিবেদনটিকে সতর্কতা সংকেত হিসেবে নিতে হবে। ঘানা ও উগান্ডার মতো দেশগুলো যদি নিজেদের প্রমাণ করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? আমাদের ৫০১ বিলিয়ন ডলারের মজবুত ভিত্তি আছে। নতুন সরকারের জন্য এখন বড় পরীক্ষা। ইশতেহারের পাতা থেকে নীতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে বাংলাদেশ বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক গন্তব্য।
লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ