ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি
ইহা এক বিস্ময়কর দেশ। এখানে নির্বাচন পরিবর্তন হয়, সরকার পরিবর্তন হয়, নীতিমালা পরিবর্তন হয়, দপ্তরের নাম পরিবর্তন হয়, এমনকি দপ্তরের সাইনবোর্ডও পরিবর্তন হয়; কিন্তু প্রশাসনের কিছু সৌভাগ্যবান নক্ষত্র যেন ঋতুচক্রেরও ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তাহারা ক্ষমতার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয়ই প্রত্যক্ষ করেন, কিন্তু নিজ আকাশে কখনও গ্রহণ লাগে না। রাজা আসেন, রাজা যান; তাহারা কেবল নতুন রাজদরবারের ভাষা শিখিয়া পুনরায় স্বাচ্ছন্দ্যে আসন গ্রহণ করেন।
সম্প্রতি এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ মর্যাদা লাভের দৃশ্য দেখিয়া নানা মহলে নানা আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে। স্মৃতির ভাঁজে চাপা পড়িয়া থাকা বহু পুরাতন উপাখ্যান আবার চায়ের কাপের ধোঁয়ার সঙ্গে উড়িয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিয়াছে। কেউ বলিয়াছেন-ইহা কেবল একজন কর্মকর্তার প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান। আবার অন্য কেহ মৃদু হাসিয়া কহিয়াছেন-রাষ্ট্রের করিডোরে ঘটনাগুলো কখনও কেবল ঘটনাই থাকে না; ইহাদের চারিপাশে কাহিনী জন্মায়, ব্যাখ্যা জন্মায়, উপকথা জন্মায়।
প্রশাসনের অলিন্দে বহুদিন ধরিয়া একটি শব্দের প্রচলন ছিল বলিয়া জনশ্রুতি-‘মায়াবতী’। ইহা কোনো সরকারি অভিধানের শব্দ নহে; কোনো বিধিমালায়ও তাহার সংজ্ঞা লিপিবদ্ধ নাই। কিন্তু অলিখিত প্রশাসনিক অভিধানে এই শব্দ নাকি এক বিশেষ বলয়, এক বিশেষ প্রভাব কিংবা এক বিশেষ ঘনিষ্ঠতার প্রতীক বলিয়া বিবেচিত হইত। কতখানি সত্য, কতখানি কল্পনা-তাহার নির্ভুল হিসাব লওয়া কঠিন। তথাপি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পুরাতন সূত্র আছে-কখনও কখনও গুজবও সমাজবিজ্ঞানের একটি তথ্য, কারণ তাহা মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন।
প্রশাসনের করিডোর অদ্ভুত স্থান। এখানে দেয়ালেরও নাকি কান আছে, আবার সেই কান কখন কী শুনিয়াছে তাহারও বহু সংস্করণ প্রচলিত থাকে। সকালের গুঞ্জন বিকালের বিশ্লেষণে রূপান্তর হয়, আর সন্ধ্যার আলোচনায় তাহাই প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্যের মর্যাদা পাইয়া বসে। কে কাহার আস্থাভাজন, কে কোন সময়ে অধিক প্রভাবশালী, কে কোন সরকারের আমলে অধিক গ্রহণযোগ্য- ইহা লইয়া আলোচনা যেন প্রশাসনিক লোকসাহিত্যেরই একটি অংশ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা জানেন, একটি স্থায়ী আমলাতন্ত্রের প্রধান শক্তি হইল ধারাবাহিকতা। কারণ নির্বাচিত সরকার পরিবর্তিত হইতে পারে, কিন্তু প্রশাসন রাষ্ট্রের স্মৃতি বহন করে। তবে সেই ধারাবাহিকতা যদি কখনও নিরপেক্ষতার পরিবর্তে ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা মতাদর্শের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখনই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা-ইহা পৃথক বিষয়; কিন্তু অভিযোগের অস্তিত্বই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
অনেকে বলেন, প্রশাসনের প্রকৃত দক্ষতা হইল নতুন সরকারের নীতিকে দ্রুত আত্মস্থ করিবার সক্ষমতা। অন্যেরা রসিকতা করিয়া বলেন-কিছু কর্মকর্তা এমনই অভিজ্ঞ যে, তাহারা শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আগেই বুঝিয়া ফেলেন, আগামী কয়েক বৎসর কোন ভাষায় কথা বলিতে হইবে। ইহা নিছক রসিকতা হইলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের অভিযোজনক্ষমতা সম্পর্কে একটি সামাজিক উপলব্ধির প্রতিফলন বটে।
আবার ইহাও সত্য যে, কেবল জনশ্রুতি বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত আলোচনার উপর ভিত্তি করিয়া কোনো কর্মকর্তার সততা বা অসততা নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নহে। প্রশাসনিক জীবনে সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, নথি, আইন এবং জবাবদিহির আলোকে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হইল- অভিযোগ মানেই অপরাধ নহে, আবার নীরবতা মানেই নির্দোষিতার প্রমাণও নহে। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত, তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন এবং আইনের শাসন।
প্রায় প্রত্যেক সরকারই ক্ষমতায় আসিবার পর একটি চিরন্তন প্রশ্নের সম্মুখীন হন- কাহাদের উপর আস্থা রাখা যাইবে? দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপর, না কি সম্পূর্ণ নতুন মুখের উপর? প্রথম বিকল্পে অভিজ্ঞতার সুবিধা থাকিলেও অতীতের সম্পর্ক লইয়া সংশয় জন্মায়। দ্বিতীয় বিকল্পে সতেজতার সম্ভাবনা থাকিলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অতএব রাষ্ট্র পরিচালনায় আস্থার প্রশ্ন কখনও একরৈখিক নহে; ইহা সর্বদাই ভারসাম্যের শিল্প।
বাংলা সাহিত্য ও লোকজ প্রবাদে এই বাস্তবতার বহু প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’ কিংবা ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’- এই উক্তিগুলো কেবল রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্য নহে; ইহারা মানুষের সেই চিরন্তন অভিজ্ঞতার প্রতীক, যেখানে বাহ্যিক দৃশ্য ও অন্তর্লোকের বাস্তবতা সবসময় এক হয় না। তবে প্রতিটি যুগই এই উক্তিগুলকে নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে, এবং প্রত্যেক ব্যাখ্যাই সমানভাবে সত্য হইবে- এমন নিশ্চয়তা নাই।
ব্যঙ্গেরও একটি দায়িত্ব আছে। ব্যঙ্গ যদি ব্যক্তি-বিদ্বেষে পরিণত হয়, তবে তাহা কৌতুক নহে; আর যদি ক্ষমতার প্রকৃতি, প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা ও মানবচরিত্রের বৈপরীত্যকে আয়নার ন্যায় প্রতিফলিত করে, তবে তাহাই সাহিত্য। সেই দৃষ্টিকোণ হইতে ‘মায়াবতী’ কেবল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতীক নহে; ইহা এমন এক রূপক, যাহা ক্ষমতার নিকটবর্তী হইবার মানবীয় আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে। যুগ বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু রূপকের প্রয়োজন ফুরায় না।
প্রশাসনের ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়াছে, যাহারা এক সময় অপরিহার্য বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিলেন, সময়ের প্রবাহে তাহারাই বিস্মৃতির অন্তরালে হারাইয়া গিয়াছেন। আবার যাহারা দীর্ঘদিন নীরবে কাজ করিয়াছেন, ইতিহাস কখনও কখনও তাহাদেরই সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। সুতরাং কোনো সাময়িক প্রভাব কিংবা অস্থায়ী প্রভাববলয়কে ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় বলিয়া গণ্য করা বিচক্ষণতার পরিচয় নহে।
একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় বিষয় হইল- প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা। ব্যক্তি পরিবর্তিত হইবেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হইবে, নীতির অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হইতে পারে; কিন্তু আইন, জবাবদিহি, মেধা ও পেশাগত সততার মানদণ্ড যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। অন্যথায় প্রতিটি শাসন পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন সন্দেহ, নতুন গুঞ্জন এবং নতুন ‘মায়াবতীর’ জন্ম হইবে।
অতএব বিচক্ষণতার দাবি একটিই- অন্ধ বিশ্বাস নয়, অন্ধ অবিশ্বাসও নয়। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা; গুজব নয়, তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া; আনুগত্য নয়, যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করা। তাহা হইলেই রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সুদৃঢ় হইবে এবং প্রশাসনের মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ থাকিবে।
শেষ কথা এই- সময় এক অদৃশ্য কূটনীতিক। সে উচ্চস্বরে তর্ক করে না, কাউকে তাৎক্ষণিক পুরষ্কারও দেয় না। সে কেবল নীরবে পর্যবেক্ষণ করে, অপেক্ষা করে, এবং একদিন কর্মের ভাষাতেই রায় ঘোষণা করে। সেই রায়ে ব্যক্তির পদবী, প্রভাব কিংবা পরিচয়ের চেয়ে অধিক মূল্য পায় চরিত্র, সততা ও দায়িত্ববোধ।
সাধু, সময় বহিয়া যায়। আর সময়ের স্রোতে অনেক নাম ভাসিয়া যায়, কিন্তু ন্যায়, প্রজ্ঞা ও সততার মূল্য কখনও পুরাতন হয় না।
লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ