৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
ড. জি. এম. শফিউর রহমান
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ৬ জুলাই। দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৭৪ বছরে পদার্পণ করেছে।
১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তুলেছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনা শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোমিন খান নাটোরে গণভবন উদ্বোধন শেষে রাজশাহীতে অবস্থান করেন।
সে সময় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল হক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আহমাদ হোসেন, জিন্নাহ হল (বর্তমান শের-ই-বাংলা হল) ছাত্র সংসদের ভিপি নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে মেইল ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবি উত্থাপন করেন। গভর্নর মসজিদ নির্মাণের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেন।
পরবর্তীতে উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনের সময় বর্তমান নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শহিদ মিনারও দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। ১৯৬৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শহীদুল্লাহ কলা ভবনের পূর্ব পাশে প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
এতে তৎকালীন শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক, বায়েজিদ আহমেদ, আবুল হোসেন, সাইদুর রহমান, একরামুল হক ও নজরুল ইসলামসহ অনেকে অংশ নেন।
পরে ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) শহিদ মিনারটির নির্মাণ সম্পন্ন করে। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এটি ধ্বংস করে দেয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৫ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এর উদ্বোধন করেন।
রাকসুর তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচিত ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’-এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করেন জাহানারা ইমাম।
শিল্পী নিতুন কুণ্ডুর নির্মিত এই ভাস্কর্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটির আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতার চারটি পঙ্ক্তি সংযোজন করা হয়, যা ভাস্কর্যটির নান্দনিকতা ও তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০০৩ সালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে নির্মিত হয় ‘গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার’। ভাস্কর মৃণাল হকের নকশায় নির্মিত এই স্থাপনাটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়।
একই বছরের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া টাওয়ারটির উদ্বোধন করেন।
পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটি দীর্ঘদিন অবহেলায় ছিল এবং উদ্বোধন-সংক্রান্ত স্মৃতিফলকে পরিবর্তন আনা হয় বলে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্মৃতিফলকে পূর্বের তথ্য পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৫ সালের ২১ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫৯তম সিন্ডিকেট সভায় মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ তিন শিক্ষক—হবিবুর রহমান, মীর আব্দুল কাইয়ুম ও সুখরঞ্জন সমাদ্দারের স্মরণে একটি শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পরবর্তীতে মূল নকশায় পরিবর্তন এনে সেখানে অতিরিক্ত উপাদান সংযোজন করা হয়, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সময় স্মৃতিফলকের একটি ধাতব ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে শহিদ তিন শিক্ষকের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘বড়কুঠি’। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ডাচ বণিকরা এটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করেন। পরে ভবনটি ইংরেজদের দখলে যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটি প্রথম প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের ক্লাব ও সহায়ক কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবেও ভবনটি ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে আওয়ামী আমলে বিশ্ববিদ্যালয় ভবনটির মালিকানা হারায় এবং ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সাত দশকের বেশি সময় ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্থাপনা শিক্ষা, আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা স্মৃতি ধারণ করে আছে।
এসব স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান চেতনার জীবন্ত স্মারক।
প্রতিষ্ঠার ৭৪তম বর্ষে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক: প্রফেসর, ম্যাটেরিয়ালস সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়