× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্রের দায়, ন্যায়বিচারের প্রত্যাবর্তন এবং সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

রাষ্ট্রের দায়, ন্যায়বিচারের প্রত্যাবর্তন এবং সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব

সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। এটি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার প্রাপ্য সুবিধা পুনর্বহালের বিষয় নয়; বরং অতীতের বিতর্কিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এ পদক্ষেপকে অনেকেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও সশস্ত্র বাহিনী-সহায়ক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, যার প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল।

রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি জনগণের আস্থা। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি পেশাদার ও শৃঙ্খলাপরায়ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আস্থা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রতিষ্ঠান শুধু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তাই এখানে যে কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব ব্যক্তি পর্যায়ের বাইরে গিয়ে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীতে তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল যে, তারা প্রশাসনিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের শিকার হয়েছেন। সেই দাবিগুলো পর্যালোচনার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাহিনীসমূহের সদর দপ্তরের মাধ্যমে একাধিক কমিটি ও বোর্ড গঠন করা হয়।

এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি আবেদনসমূহ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার ১৫০ জন কর্মকর্তাকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধাও নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করা হবে।

এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। এটি কোনো আকস্মিক বা একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি দীর্ঘ প্রশাসনিক পর্যালোচনা, মূল্যায়ন এবং সুপারিশের মাধ্যমে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সরকার একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতীতের অভিযোগসমূহ পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা করেছে।

তবে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানও গভীরভাবে জড়িত। যদি কোনো সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত বিবেচনা বা পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের কারণে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা। কারণ রাষ্ট্র কখনোই কেবল বর্তমান সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।

সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্বের মূল ভিত্তি হলো যোগ্যতা, শৃঙ্খলা এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। একজন কর্মকর্তা যখন তার কর্মজীবনে পদোন্নতি বা দায়িত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব অনুভব করেন, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হয় না; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে। এই আস্থার সংকট দীর্ঘমেয়াদে একটি পেশাদার বাহিনীর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। রাষ্ট্র যদি অতীতের বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্তও তৈরি করে, যেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে গৃহীত হবে।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। যে কোনো পুনর্বাসন বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির প্রক্রিয়া যতটা স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর এবং নিরপেক্ষ হবে, ততটাই এটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কারণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত শুধু ঘোষণা দিয়ে নয়; বরং তার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েও মূল্যায়িত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা পুনর্গঠন। কেবল অতীতের ক্ষতিপূরণই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে পদোন্নতি, বদলি, অবসর ও শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্তগুলোতে যদি স্বচ্ছতা ও মানদণ্ড সুস্পষ্ট থাকে, তাহলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়।

এছাড়া, এই সিদ্ধান্তের আরেকটি পরোক্ষ দিক হলো রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন। অনেক সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহ সময়ের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হলো সেই প্রশ্নগুলো উপেক্ষা না করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার উত্তর খোঁজা। সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই দিকেরই একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত বার্তাও বহন করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী, কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হতে পারে না। এখানে যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বই চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত। প্রশাসনিক বা সামরিক কাঠামোয় রাজনৈতিক প্রভাব যত কম থাকবে, ততই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর হবে।

অন্যদিকে, যারা সত্যিকার অর্থে বৈষম্য বা অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তাদের মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। ন্যায়বিচার কখনো বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা চিরতরে অস্বীকার করা রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীতিগত অবস্থানই রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থা বজায় রাখে। সেই আস্থারই প্রতিফলন ঘটেছে সরকারের এই সিদ্ধান্তে।

সবশেষে বলা যায়, এই সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন কেবল ১৫০ জন কর্মকর্তার পুনর্বাসনের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠার একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ যদি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যায়, তবে তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা