মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম
উৎসব এলেই মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে যায়। কিন্তু এই যাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবের আনন্দ থেকে বিষাদে পরিণত হয়। যানজট আর দুর্ঘটনায় যাত্রাপথে নেমে আসে চরম শোক এবং দুর্ভোগ। বেপরোয়া গতির সাথে দায়িত্বহীনতা, অসাবধানতা আর অসচেতনতায় ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। উৎসবে কোটি মানুষের স্থানান্তর হয়। এই স্থানান্তরের সাথে মিশে আছে পরিবহন, চালক, মালিক আর সড়ক। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, মুনাফা বা আয়ের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা এবং চালক-যাত্রী উভয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কোন রাস্তায় কোন গাড়ির গতিবেগ কত হতে হবে কিংবা চালক একটানা কত সময় গাড়ি চালাবে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। গাড়ির গতির সর্বোচ্চ ক্ষমতা কিংবা সে গতি কতটুকু পরিসীমায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত শিক্ষার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়।
উৎসবের সময়ে স্বাভাবিকভাবেই ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। আর অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের চাপ থেকেই অতিরিক্ত মুনাফা কিংবা অধিক আয় বৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এই প্রতিযোগিতায় চালককে মালিকের প্রত্যাশা পূরণে মাত্রাতিরিক্ত গাড়ি চালাতে হয়। চালকের চাকরির নিশ্চয়তা আর মালিকের অধিক মুনাফা যেন একসূত্রে গাঁথা। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ, আর অতিরিক্ত ট্রিপ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত গতি। অতিরিক্ত ট্রিপের ক্লান্তি দূর করতে অনেক সময় চালকের আসনে বসছে হেলপার। এই অতিরিক্ত ট্রিপ আর অতিরিক্ত গতি হয়তো অতিরিক্ত মুনাফা আনছে, তবে তা জীবনের মতো অতি উচ্চমূল্য পরিশোধের বিনিময়ে। এভাবেই গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনার এক জটিল চক্র চলতে থাকে। এই চক্রে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালক। পরিবহন যেন টাকার মেশিন, আর চালকগণ হচ্ছেন সেই মেশিনের চাবি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা এর চালকের ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা মালিক-চালক কারও কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। অদক্ষ চালক অপরিচিত রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে নির্বিকারভাবে। নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট ড্রাইভার নিয়োজিত থাকার মতো সংস্কৃতি আজও আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গাড়ির স্টিরারিংয়ের হাত বদল যেন বিনিময় প্রথার উন্নত সংস্করণ। রাস্তায় পুরোপুরি বসে না পড়া পর্যন্ত গাড়ি গ্যারেজে যাবে না, এমন অসুস্থ চিন্তা প্রায়শই দৃশ্যমান। এটাই যেন আমাদের সংস্কৃতির ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় সিটি সার্ভিসের বাসগুলোকে দূরপাল্লার রাস্তায় নামিয়ে চলছে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠা বা নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী নামার মতো দায়িত্বশীল আচরণ সচরাচর গোচরীভূত হয় না। ব্যস্ত সড়কে চলন্ত গাড়িতে যাত্রী ওঠানামার দৃশ্য কেবল বাংলাদেশেই দেখা যায়। পরিবহন চালকরাও ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে থেমে থেমে যাত্রী ওঠানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এ কারণে অপচয় হওয়া সময়কে ‘কভার’ করতে তারা ছুটে চলতে শুরু করে দুরন্ত গতিতে। তা ছাড়া চালক-যাত্রী অনেকেই গাড়ি চালানো কিংবা রাস্তা পারাপারের সময় দিব্যি মোবাইল ফোনে কথা বলে যান। তারা এটা মোটেও ভাবেন না যে, এর ফলে যেকোনো সময় মৃত্যুদূত হাজির হতে পারে।
কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি আর রাস্তাতেই কাটে পরিবহন চালক ও হেলপারের জীবন। রাত গাড়িতেই কাটে, এমন চিত্রও বিরল নয়। এই জীবন আমৃত্যু এভাবেই ছুটে চলে, যেখানে সামাজিকতার কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই ব্যস্ত জীবনের পরিসরে নির্মল আনন্দ নেই, নেই কোনো স্বপ্ন; আছে কেবল নিত্যদিনের চাহিদা আর বেঁচে থাকার যুদ্ধ। শত-সহস্র যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে নিয়ে গেলেও ধন্যবাদ দেওয়ার মতো সৌজন্যবোধ কোনো যাত্রীর মধ্যে দেখা যায় না। এই কর্মব্যস্ততা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, পারিবারিক সময়ের অভাব এবং সামাজিক মূল্যায়নের সংকটের কারণে কিছু কিছু চালক জড়িয়ে পড়ছেন মাদকের জালে। অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণে চালকদের মধ্যে পেশাদারত্বের মনোভাব তৈরি হচ্ছে না।
প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। কেবল মুনাফাই মূল কথা নয়, জীবনের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি সকলকে উপলব্ধি করতে হবে। তাই সড়কে প্রাণ রক্ষা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়; মালিক, চালক ও যাত্রী সকলকে সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। চালককে তার পরিবহনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা এবং গতির সমন্বয়ের যোগ্যতা ও মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন একজন সুস্থ মানুষ হতে হবে। তাদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গাটি অনুধাবন করাতে হবে এবং সামাজিক জীবনের সাথে সংযোগ ঘটাতে হবে।
গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একজন ড্রাইভার সপ্তাহে কিংবা দৈনিক কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবেন, তা নির্ধারণ করে দিতে হবে। আমরা সাধারণত দেখতে পাই উন্নত বিশ্বে একজন ড্রাইভার একটানা দিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারেন। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আমাদের দেশেও তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে একটি স্মার্ট সিস্টেমে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার থাকবে, যার অধীনে সকল চালক সংযুক্ত থাকবেন। চালক তার ডিউটি শুরুর পূর্বে আঙুল স্ক্যান (Fingerprint) করবেন এবং ডিউটি শেষ করার সময় আবার স্ক্যান করবেন। স্ক্যান না করলে ওই গাড়ি কেন্দ্রীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় সংকেত প্রেরণ করবে। চালকের পাশাপাশি মালিককেও দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে হবে। চালক যেমন ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালাবেন না, ঠিক তেমনি মালিকও লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে তার মূল্যবান সম্পদ হস্তান্তর করবেন না। এক রুটের গাড়ি অন্য রুটে কিংবা স্বল্পপাল্লার গাড়ি দূরপাল্লায় যাতে না চলে, সে বিষয়েও মালিককে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রত্যেক চালককে নিয়োগপত্রের মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে। চাকরির নিশ্চয়তা যেমন তার পরিবহনের প্রতি দায়িত্ব বাড়াবে, তেমনি চালকের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
দুর্ঘটনাকবলিত একটি পরিবার কী ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তা চালকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ১০ মিনিট আগে পৌঁছার চেয়ে ১০ বছর বেশি বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তা বোঝার মতো মানসিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি বেশি প্রয়োজন রাস্তার সুস্থতা। দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে চলছে ধীরগতির যানবাহন, যাদের না আছে রুট পারমিট, না আছে লাইসেন্স। এসব বাহনের মহাসড়কে প্রবেশাধিকার জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধে লাইসেন্স এবং রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সর্বোপরি মালিক, চালক ও যাত্রী সকলেই আইনের প্রতি দায়িত্বশীল হলেই থামবে উৎসবের কান্না এবং নিশ্চিত হবে নিরাপদ যাত্রা।
লেখক : মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা
জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম।