আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ফাইল ছবি
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো ঘোষণা দিচ্ছেন, চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন, কখনো বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন, কখনো নিজেকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একমাত্র প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।
অথচ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাবেক সরকারপ্রধানের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের মাটি ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনীতি নিয়ে ধারাবাহিক রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সৌজন্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার ভারত সরকারকে প্রকাশ্যে অনুরোধ করেছিলেন, ভারতের ভূখণ্ড যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্ল্যাটফর্মে পরিণত না হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার, আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক- সব ক্ষেত্রেই তিনি একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।
কিন্তু দৃশ্যমানভাবে ভারতের নীতিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, নয়াদিল্লি এখনও শেখ হাসিনাকে একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ‘কার্ড’ হিসেবেই ব্যবহার করতে চায়।
সম্প্রতি শেখ হাসিনা আবারও ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এই বছরই দেশে ফিরবেন। একই সময়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের মালয়েশিয়া ও চীনমুখী কূটনৈতিক সক্রিয়তা, সীমান্তে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ফলে প্রশ্ন জাগে, ভারত কি এখনও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চায়, নাকি ১৮ কোটি মানুষের সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়?
সীমান্ত পরিস্থিতিও দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল অধ্যায়। সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও কথিত ‘পুশ-ইন’ এর অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী দেশপ্রেমিক ও সচেতন জনগণ দৃঢ় অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশ কোনো আপস করবে না। আধুনিক বিশ্বে সীমান্ত কখনো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে পারে না, এটি আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক সম্মান এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার বিষয়।
এখানে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনারকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে কিছু প্রবাসী ইউটিউবার ও আত্মঘোষিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক নবনীতা চৌধুরীরা এমন এক বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শুরু করেছেন, যেন বাংলাদেশ ভয়াবহ কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে।
কেউ বলছেন, ভারত নাকি বাংলাদেশকে চাপে ফেলতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। কেউ আবার এটিকে ‘হুমকির কূটনীতি’ বলে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, চটকদার শিরোনাম আর দর্শক বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় তারা কূটনীতির মৌলিক বাস্তবতাকেই বিসর্জন দিয়েছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা কূটনৈতিক প্রটোকল সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তারা কখনো এমন কথা বলতে পারেন না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত রীতি হলো- যে দেশকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে অধিক অভিজ্ঞ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কূটনীতিককে পাঠানো হয়।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারত বাংলাদেশে মন্ত্রী পদমর্যাদার একজন হাইকমিশনার নিয়োগ দিয়েছে। বস্তুতপক্ষে এটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন করে মেরামত করার রাজনৈতিক বার্তা।
এরই মধ্যে ভারত পুনরায় পর্যটন ভিসা চালু করেছে। নতুন হাইকমিশনারও সম্পর্ক উন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সীমান্ত সমস্যা দ্রুত কেটে যাবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একই সঙ্গে যদি শেখ হাসিনাকে ঘিরে ব্যক্তি-নির্ভর নীতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সেই ইতিবাচক বার্তাগুলো জনগণের কাছে আন্তরিকতার বদলে কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হবে। কারণ কূটনীতিতে প্রতীকী উদ্যোগের চেয়ে নীতিগত পরিবর্তনের মূল্য অনেক বেশি।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি মৌলিক বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি। শেখ হাসিনা হয়তো একসময় ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের ভেতরেও তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আকস্মিক দেশত্যাগ, নেতাকর্মীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে বিদেশে আশ্রয় নেওয়া এবং দূর থেকে রাজনৈতিক নির্দেশনা। এসব বিষয় তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কল্পনা করা বাস্তবতার চেয়ে অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরারই নামান্তর।
এ কথাও সত্য যে শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। শেখ হাসিনার সেই আলোচিত বক্তব্য, “আমি ভারতকে যা দিয়েছি, ভারত তা কোনো দিন ভুলবে না” এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক” কিংবা “হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতকে অনুরোধ করেছি” এসব বক্তব্য জাতীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশের কাছে সমমর্যাদার কূটনীতির ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
ভারত যদি এখনও সেই রাজনৈতিক ঋণের হিসাব মেলাতে গিয়ে শেখ হাসিনাকেই বাংলাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে তা ভবিষ্যতের সম্পর্কের জন্য মোটেও শুভ হবে না।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন। জুলাইয়ের সহিংসতাসহ বিভিন্ন ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে দেশীয় বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনা হয়েছে। ফলে তার দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। আইনের সামনে প্রত্যেক নাগরিকের সমান জবাবদিহি নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
শেখ হাসিনা দাবি করছেন, তিনি ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্য দেশে ফিরবেন। কিন্তু তার যে শাসনামলকে ঘিরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ বছরের পর বছর আলোচিত হয়েছে, সেই অধ্যায় সম্পর্কে আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার কোনো প্রকাশ না ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকার কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
ভারতের জন্যও সময় এসেছে একটি মৌলিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার। বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সমার্থক নয়। বাংলাদেশের জনগণ ব্যক্তি-নির্ভর সম্পর্ক নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা কিংবা আঞ্চলিক সংযোগ এসব ক্ষেত্র দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের বিষয়। সেই সম্পর্ক যদি একটি মাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। দূরদর্শী কূটনীতি কখনো এমন হয় না।
বাংলাদেশেরও উচিত আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। ভারত যেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, তেমনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের পরিচয়। আধুনিক কূটনীতি কোনো একক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি ভারসাম্য, পারস্পরিক স্বার্থ এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
এখানে ভারতের প্রতি আমার একটি আন্তরিক ও স্পষ্ট আহ্বান- বাংলাদেশকে আর ‘হাসিনা কার্ড’-এর দৃষ্টিতে দেখবেন না। বাংলাদেশের জনগণের রায়কে সম্মান করুন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করুন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে সম্মান করুন। ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, রাষ্ট্র চিরস্থায়ী। সরকার আসে সরকার যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলায়, কিন্তু প্রতিবেশী দেশ কখনো বদলায় না।
আজকের বাংলাদেশ আর কোনো ব্যক্তি বা দলের মাধ্যমে নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদা ও জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন আস্থা, সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি স্থায়ী ও টেকসই সম্পর্ক নির্মাণ করতে চায়, তাহলে তাকে অতীতের ব্যক্তি-নির্ভর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না বরং তা নির্ভর করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতি এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি আন্তরিক সম্মানের ওপর। শেখ হাসিনা আজ আছেন, কাল নাও থাকতে পারেন অন্য নেতৃত্বও আসবে, যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ থাকবে, ভারতও থাকবে। তাই ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্মিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামনে আজ যে অচলাবস্থা ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভাঙার প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে ভারতের ‘হাসিনা কার্ড’ রাজনীতির অবসান। এই বাস্তবতা যত দ্রুত নয়াদিল্লি উপলব্ধি করবে, তত দ্রুত দুই দেশের সম্পর্কে নতুন আস্থা, নতুন ভারসাম্য এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সর্বাগ্রে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা বন্ধ করা অত্যন্ত ভারতের জন্য জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক (আমার দিন)