× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ন্যায়বিচারই হোক মূল লক্ষ্য

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অতীত সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের দাবি, কমিশন গঠন কিংবা বিচারিক অনুসন্ধানের আহ্বানও নতুন নয়। তবে এবার বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সংঘটিত সম্ভাব্য দুর্নীতির তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে ওই সময়ের প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়-দুর্নীতি কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল।

এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি বড় পরীক্ষাও বটে।

প্রথম প্রশ্ন হলো-দুর্নীতির তদন্ত কি সময়ভিত্তিক হবে, নাকি নীতিভিত্তিক?

যদি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে সেটি অবশ্যই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি, সরকার বা প্রশাসন তদন্তের ঊর্ধ্বে নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি কেবল নির্বাচিত সরকারের জন্য নয়; অন্তর্বর্তী, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা অন্য যেকোনো প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসে। তদন্ত কি কেবল একটি নির্দিষ্ট ১৮ মাসকে কেন্দ্র করে হবে, নাকি একই মানদণ্ডে অতীত ও বর্তমান— সব সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও সমান গুরুত্ব পাবে?

জনগণের কাছে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। কারণ নির্বাচিতভাবে তদন্ত পরিচালিত হলে সেটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা বাড়ায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন, ওই প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে কোনো গবেষণা বা প্রতিবেদনের উল্লেখ করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি— প্রতিবেদন কখনো আদালতের রায় নয়। গবেষণা দুর্নীতির প্রবণতা, ঝুঁকি কিংবা কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধ প্রমাণের জন্য আইনি তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

অতএব, টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তদন্তের সূচনা হতে পারে, কিন্তু তদন্তের শেষ কথা নয়।

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে জনমতের আরেকটি বাস্তবতা হলো— প্রায় প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলেছে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দুর্নীতি কমেনি। বরং বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক খাত, অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি ক্রয়, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, সমস্যাটি কি কেবল ব্যক্তি বা সরকারের, নাকি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতারও?

যদি দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক, সংসদীয় কমিটি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে কোনো সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হতো না। দুর্নীতির অভিযোগ তখনই তদন্তের আওতায় আসত, যখন অভিযোগ উঠেছে।

এখানেই বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রশ্ন সামনে আসে।

দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে, রাজনৈতিক চাপ থেকে কতটা মুক্ত থাকে কিংবা বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম— এসব প্রশ্ন বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় এসেছে।

সুতরাং, যদি সত্যিই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রতিটি অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা হয়, তবে একই মানদণ্ডে বর্তমান সরকার এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময়কার অভিযোগও তদন্ত করতে হবে। অন্যথায় জনগণের একাংশের কাছে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অতীত সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সেই তদন্ত দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ নিয়েছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থেকেছে, কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেনি।

অথচ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্নীতি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতা, সম্পদের বাধ্যতামূলক ঘোষণা, স্বার্থের সংঘাত নীতিমালা, স্বাধীন নিরীক্ষা, তথ্য অধিকার আইন কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বিচারিক স্বাধীনতা— এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি কমাতে বেশি কার্যকর।

শুধু তদন্ত নয়, প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ

যদি প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্ত, বড় প্রকল্পের ব্যয়, বিদেশি ঋণের ব্যবহার, সরকারি ক্রয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগও অনেক কমে যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিদেশি ঋণের বিষয়ও এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণ, অবকাঠামো ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের উন্মুক্ততা। কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, ব্যয় কতটা যৌক্তিক ছিল, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়েছে কি না— এসব তথ্য জনগণের কাছে সহজলভ্য হলে রাজনৈতিক বিতর্কের অনেকটাই তথ্যভিত্তিক হয়ে ওঠে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ কেবল ভোটার নয়; তারা করদাতা। ফলে জনগণের অর্থ কোথায় ব্যয় হলো এবং সেই ব্যয়ে কোনো অনিয়ম ছিল কি না— এ প্রশ্ন করার অধিকার তাদের রয়েছে।

তদন্তের দাবি তাই অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটি স্বাভাবিক। তবে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে তার পরিধি, পদ্ধতি এবং নিরপেক্ষতার ওপর।

যদি তদন্ত কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি আরেকটি রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু যদি আইনের শাসনের ভিত্তিতে প্রমাণনির্ভর, স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন তদন্ত পরিচালিত হয়, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, অভিযোগের সংখ্যা অনেক; কিন্তু চূড়ান্ত বিচার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে জনগণের মধ্যে একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কি সত্যিই দুর্নীতি কমানোর জন্য, নাকি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ?

এই সংশয় দূর করার একমাত্র উপায় হলো সমান আইনি মানদণ্ড।

যদি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস তদন্ত হয়, তবে একইভাবে অন্যান্য সময়কালও তদন্তযোগ্য হতে হবে। যদি একজন সাবেক কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হন, তবে বর্তমান দায়িত্বশীল ব্যক্তিও একই আইনি মানদণ্ডের আওতায় আসবেন। আইনের চোখে সমতা কেবল সংবিধানের নীতি নয়; এটি দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়েরও প্রধান শর্ত।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি একটি মৌলিক নীতিতে এসে দাঁড়ায়-রাষ্ট্র কি ব্যক্তি বা সরকারের আনুগত্য দেখবে, নাকি আইনের?

যদি উত্তর হয় আইন, তবে তদন্তের ক্ষেত্রেও সেই নীতি অনুসরণ করতে হবে। কোনো সময়কাল, কোনো সরকার কিংবা কোনো ব্যক্তি তদন্তের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। আবার কোনো সময়কালকে আলাদা করে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করাও উচিত নয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন সেটি হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক এবং সর্বজনীন। অন্যথায় তদন্তের আহ্বান রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করলেও রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগটি অপূর্ণই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের নাগরিকরা এখন সম্ভবত আর নতুন অভিযোগ শুনতে চান না; তারা দেখতে চান কার্যকর তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী নীতির পরিবর্তন হবে না। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান যদি ব্যক্তি বা সরকারের ওপর নির্ভর করে, তবে সেটি নীতি নয় রাজনীতি। আর যদি একই আইনের আলোয় সবাইকে বিচার করা যায়, তবেই সেটি প্রকৃত জবাবদিহির সূচনা।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা