কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি
ভবিষ্যৎকে জানার সর্বোত্তম উপায় হলো-নিজের হাতে সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। এই দর্শনই একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতি ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
ইতিহাসের প্রতিটি যুগেরই একটি প্রধান শক্তি ছিল। কৃষিযুগে ভূমি, শিল্পবিপ্লবের যুগে কারখানা, আর বিংশ শতাব্দীতে পুঁজি ছিল উন্নয়নের ভিত্তি। কিন্তু বর্তমান শতাব্দীতে সেই শক্তির কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে। এখন জ্ঞান, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, তথ্য, মানবসম্পদ এবং ব্র্যান্ডই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ।
আজ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অনেক ক্ষেত্রেই খনিজ, তেল বা বিশাল ভূখণ্ড নয়; বরং একটি ধারণা, একটি সফটওয়্যার, একটি অ্যালগরিদম, একটি ব্র্যান্ড কিংবা সৃজনশীল মানবমেধা। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহু প্রতিষ্ঠান আমাদের সামনে উন্নয়নের নতুন দর্শন তুলে ধরেছে। তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন দেখিয়েছে, উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে গ্রাহক ও নাগরিককে। প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ভাষায়, গ্রাহক আমাদের অতিথি, আর আমরা তাদের সেবাদাতা। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই দর্শন প্রযোজ্য। নাগরিককে সেবা দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার জীবন আমাদের শেখায়, সীমাবদ্ধতা নয়, স্বপ্নই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। প্রতিকূলতা সাফল্যের পথে বাধা নয়; বরং নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-সম্পদের অভাবের চেয়ে কল্পনাশক্তির অভাব অনেক বেশি ক্ষতিকর।
মাইক্রোসফট এবং আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি দেখিয়েছে, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। অর্থনীতিবিদ পল রোমার যথার্থই বলেছেন, ধারণাই সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী যদি দক্ষতা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তরিত হয়, তবে সেটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
গুগল বিশ্বের তথ্যকে সংগঠিত করেছে, আর অ্যাপল প্রযুক্তিকে নান্দনিকতা ও ব্যবহারবান্ধবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। স্টিভ জবসের ভাষায়, উদ্ভাবনই নেতৃত্ব ও অনুসরণের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। যে জাতি নতুন কিছু সৃষ্টি করে, নেতৃত্ব তার হাতেই যায়; আর যে জাতি শুধু অনুকরণ করে, তাকে অনুসারী হয়েই থাকতে হয়।
টেসলা দেখিয়েছে, ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সাহসই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবট প্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি এবং গভীর প্রযুক্তির মতো খাতে এখন থেকেই বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং প্রমাণ করেছে, উন্নয়ন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা এবং নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফলেই একটি ছোট প্রতিষ্ঠান বিশ্বনেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
রোলেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে, উৎকর্ষতার কোনো বিকল্প নেই। একটি পণ্যের মূল্য শুধু তার কাঁচামালে নয়; বরং তার নির্ভুলতা, গুণগত মান এবং মানুষের আস্থায় নিহিত থাকে। বাংলাদেশকেও স্বল্পমূল্যের পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে বিশ্বমানের পণ্য তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
হার্মেস, লুই ভুইতোঁ ও অন্যান্য বিলাসবহুল ব্র্যান্ড আমাদের শেখায়, ব্র্যান্ডই আধুনিক বিশ্বের নতুন স্বর্ণখনি। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড কাঁচামালের মূল্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের জামদানি, মসলিন, নকশিকাঁথা, চামড়াজাত পণ্য, মৃৎশিল্প ও হস্তশিল্প আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখে। এখন সময় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থেকে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার।
জারা দেখিয়েছে, আধুনিক প্রতিযোগিতায় শুধু বড় হওয়াই যথেষ্ট নয়; দ্রুত সিদ্ধান্ত, দ্রুত উৎপাদন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত অভিযোজনই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের প্রশাসন, শিক্ষা ও শিল্পনীতিতেও এই গতিশীলতা প্রয়োজন।
টয়োটার ‘ক্রমাগত উন্নয়ন’ দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। জাতীয় উন্নয়নও ঠিক একইভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়।
স্টারবাকস দেখিয়েছে, শুধু পণ্য নয়, মানুষের অভিজ্ঞতাও মূল্যবান। অন্যদিকে নেটফ্লিক্স ও ডিজনি প্রমাণ করেছে, গল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা থেকেও বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত ও লোকঐতিহ্যও সৃজনশীল অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।
বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো দেখিয়েছে, তথ্য শুধু সংবাদ নয়; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের অন্যতম শক্তিশালী সম্পদ। একইভাবে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বলে, সুশাসন, মেধাভিত্তিক প্রশাসন, শৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য তাই কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে- নাগরিককেন্দ্রিক সেবা, বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নিজস্ব বৈশ্বিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলা, গুণগত মান নিশ্চিত করা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, দক্ষ প্রশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের সংস্কৃতি।
একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, তার মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতায় নিহিত। যে দেশ জ্ঞানকে পুঁজি, উদ্ভাবনকে সংস্কৃতি, সুশাসনকে ভিত্তি, গুণগত মানকে অভ্যাস এবং মানবসম্পদকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, সেই দেশই ভবিষ্যতের বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়।
বাংলাদেশের সামনেও সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। প্রয়োজন কেবল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, ধারাবাহিক নীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের প্রতি অটল অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে একদিন বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নামও গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি