× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তাহিরপুরের ঘটনা: অপরাধের বিচার, নাকি সম্প্রদায়ের শাস্তি?

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬ ১৯:৩৫ পিএম

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬ ২০:১৯ পিএম

রাসেল আহমদ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাসেল আহমদ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বুধবার সকালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গড়কাটি গ্রামের বাড়িটিতে শুধু চাপা কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অভিযুক্ত তরুণ জেলহাজতে, পরিবারের কয়েকজন সদস্য বাড়িছাড়া, ঘরের দরজা-জানালা ভাঙা, আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চারদিকে। কয়েক শ গজ দূরে একটি মন্দিরে ভাঙচুরের চিহ্ন। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই আতঙ্কে।

একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনা কীভাবে একটি পুরো জনপদকে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের মুখে ঠেলে দিল- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তাহিরপুর আজ সেই প্রশ্নের মুখোমুখি।

ঘটনার সূত্রপাত একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে।

অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ভাঙচুরের শিকার হওয়া মন্দির। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, আদালত সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবেন এবং প্রয়োজন হলে শাস্তি দেবেন।

কিন্তু তাহিরপুরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্যত্র—অভিযোগ একজনের বিরুদ্ধে, অথচ আতঙ্কে কেন একটি পুরো সম্প্রদায়?

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঘটনার পর অভিযুক্ত তরুণের বাড়িঘর, দোকানপাট এবং একাধিক মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। 

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিরও প্রশ্ন।

সভ্য রাষ্ট্রের একটি মৌলিক নীতি হলো, অপরাধ ব্যক্তির, সম্প্রদায়ের নয়। একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার আদালত করবেন। 

কিন্তু সেই অভিযোগের দায় যদি তার পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর এসে পড়ে, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্র যখন বিচার করছে, তখন জনতার হাতে প্রতিশোধের অধিকার থাকতে পারে না। আর যদি জনতার প্রতিশোধই বিচার হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তাহিরপুরের ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং অদ্বৈত মহাপ্রভুর স্মৃতিবাহী এই অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয় সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। 

হাওরাঞ্চলের মানুষ বন্যা, ঝড়, নদীভাঙন কিংবা ফসলহানির সময় ধর্ম-বর্ণের বিভাজন না দেখে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সেই সমাজে অবিশ্বাসের বীজ বপন করা শুধু একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্যের ওপরও আঘাত।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকৃত সত্য এখনও পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য, স্ক্রিনশট কিংবা অভিযোগের উৎস ও সত্যতা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

ফলে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই উত্তেজনা তৈরি হওয়া এবং পরে তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই উত্তেজনা কি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো সংগঠিত উসকানি, গুজব কিংবা রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করেছে?

প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়; অনেক সময় এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট শক্তির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

তাই গড়কাটির ঘটনাতেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনার পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেন। 

একই সঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে; তাই হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষকে সজাগ থাকতে হবে এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।

তিনি আরও ঘোষণা দেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেমন আইনগত ব্যবস্থা চলবে, তেমনি হামলা, ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার আহ্বানও জানান তিনি।

এ ধরনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির কাজ কেবল অপরাধের নিন্দা করা নয়; একই সঙ্গে নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বার্তা দেওয়া।

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও ভাঙচুর হওয়া মন্দিরগুলো সংস্কারের দায়িত্ব নেওয়ার যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে একই সঙ্গে প্রত্যাশা থাকবে, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করে।

প্রকৃতপক্ষে তাহিরপুরের মতো একটি অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়া শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি নয়; এটি সেই অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যারা হামলা, ভাঙচুর কিংবা লুটপাটে অংশ নিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন ও পুনর্বাসনের উদ্যোগও নিতে হবে।

কারণ নাগরিকদের মধ্যে যদি নিরাপত্তাহীনতা থেকেই যায়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা আংশিক সফল হলেও সামাজিক আস্থা ফিরবে না।

বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদী চরিত্রে। এই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু পরিচয়ের মানুষের সম্মিলিত নির্মাণ।

সেই বাস্তবতায় সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

গড়কাটির ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একজন তরুণের ফেসবুক পোস্টের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি আইনকে বিচারক মানব, নাকি উত্তেজিত জনতাকে? আমরা কি সহাবস্থানের ঐতিহ্য রক্ষা করব, নাকি গুজব, ঘৃণা ও প্রতিশোধের কাছে তা বিসর্জন দেব?

কারণ সম্প্রীতি ভাঙতে কয়েক ঘণ্টাই যথেষ্ট; কিন্তু সেই আস্থা ও সহাবস্থান পুনর্গঠনে লেগে যায় কয়েক প্রজন্ম।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা