মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি নিছক সৌজন্য সফর নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির এক সুস্পষ্ট রূপরেখা।
জেনে রাখা ভালো, রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যা কেবল একটি সরকারের নীতিগত অবস্থানই প্রকাশ করে না; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এলডিসি-উত্তর বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বাস্তববাদী কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। রেমিট্যান্স আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা প্রশাসনিক জটিলতা, সিন্ডিকেট নির্ভরতা এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার পুনরায় সম্প্রসারণ, নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ বিনিময় এবং অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা। কারণ দেশের বিপুল যুবশক্তিকে উৎপাদনশীল খাতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমবাজার এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তবে এই সফরের গুরুত্ব শুধু শ্রমবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিক্ষা, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করতে পারে।
মালয়েশিয়া সফরের পর প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় চীনের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র হিসেবে চীন আজ বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
গত এক দশকে বাংলাদেশ - চীন সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর কেবল আনুষ্ঠানিক সাফল্য নয়; বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করার ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থায় চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান হতে পারে। ফলে এই সফরের মাধ্যমে কেবল অর্থায়ন নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্রও উন্মোচিত হয়েছে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও চীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যদিও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো বাংলাদেশের অনুকূলে নয়, তবুও বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল শিল্প এবং আইটি সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ধারণ করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সময়ের পরিবর্তনে বৈশ্বিক বাস্তবতা বদলালেও এই নীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট। মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই নীতির আধুনিক ও বাস্তববাদী প্রতিফলন বলেই প্রতীয়মান হয়।
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে কূটনৈতিক সফরের প্রকৃত সাফল্য কেবল যৌথ ঘোষণায় নয়; বরং বাস্তবায়নের সক্ষমতায় নিহিত। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক চুক্তি ও সমঝোতা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বাস্তবায়ন ঘাটতির কারণে। তাই এবার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সফরে অর্জিত প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের যেসব সম্ভাবনা এই সফরের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে পারলেই জনগণ এর সুফল ভোগ করবে। অন্যথায় কূটনৈতিক অর্জন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তরুণ জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, কার্যকর কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব।
সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক। এটি শুধু দুটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নয়; বরং নতুন বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসী, উন্নয়নমুখী ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির এক শক্তিশালী ঘোষণা। সফরে অর্জিত চুক্তি, সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতিগুলো যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর সুফল দীর্ঘদিন ধরে বয়ে যাবে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিচারে তখন এই সফরকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রযাত্রার এক স্মরণীয় ও সার্থক অধ্যায় হিসেবেই মূল্যায়ন করা হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট