× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টাঙ্গুয়ার হাওর: প্রয়োজন নতুন দর্শন ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

যত দর্শনার্থী বাড়ছে তত দূষণ বাড়ছে টাঙ্গুয়ার হাওরে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

যত দর্শনার্থী বাড়ছে তত দূষণ বাড়ছে টাঙ্গুয়ার হাওরে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

টাঙ্গুয়ার হাওর এখনও মানচিত্রে আছে। কিন্তু যে হাওর একসময় পরিযায়ী পাখির ডানায় আকাশ ঢেকে দিত, যে হাওর ছিল দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার, হিজল-করচের বন আর জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য আশ্রয়স্থল, সেই টাঙ্গুয়ার হাওর কি আজও আগের মতো আছে?

এই প্রশ্ন আমার কাছে কেবল পরিবেশগত নয়, ব্যক্তিগতও। কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরের তীরবর্তী একটি গ্রামে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশবের যে হাওরকে আমি দেখেছি, আজ তার সঙ্গে বর্তমানের টাঙ্গুয়ার হাওরের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো।

পাখি কমেছে, মাছ কমেছে, বন কমেছে, জলজ উদ্ভিদ কমেছে; এমনকি হারিয়ে গেছে বহু বিলও। প্রকৃতি একদিনে ধ্বংস হয় না। দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীনতার স্তর জমতে জমতেই একসময় সংকট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। টাঙ্গুয়ার হাওর আজ সেই সংকটের মুখোমুখি।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এই জলাভূমি শুধু একটি হাওর নয়; এটি দেশের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় সম্পদ। অথচ বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও এর পরিবেশগত স্বাস্থ্য ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে টাঙ্গুয়ার হাওরের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য ‘কমিউনিটি-বেসড ম্যানেজমেন্ট অব টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়েটল্যান্ড ইকোসিস্টেম’ প্রকল্পে প্রায় ২৫৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জিইএফ অনুদান প্রায় ৪৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং সহ-অর্থায়ন প্রায় ২০৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু এই বরাদ্দকে ঘিরে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো-অতীতে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য, বনজ সম্পদ, মাছের উৎপাদন এবং পরিবেশগত সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি?

এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে নতুন প্রকল্প শুরু করা মানে পুরোনো ভুলের ওপর নতুন ব্যয়ের স্তর যোগ করা।

১৯৯৯ সালে সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা করে। পরে এটি রামসার সাইটের মর্যাদা লাভ করে। এরপর বিভিন্ন সময় সরকার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। গঠিত হয়েছে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, সমিতি ও নানা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও হয়েছে ব্যাপকভাবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ কাঠামো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সভা-সেমিনার হয়েছে, প্রতিবেদন লেখা হয়েছে, কিন্তু হাওরের সংকট কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও গভীর হয়েছে।

এখানে আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট মূলত অর্থের সংকট নয়; এটি দর্শনের সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে আমরা প্রকল্পকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছি, অথচ প্রকল্প হওয়া উচিত ছিল একটি মাধ্যম। আমরা ব্যয়ের হিসাব রেখেছি, কিন্তু ফলাফলের হিসাব করিনি। আমরা নতুন কমিটি গড়েছি, নতুন কর্মশালা করেছি, নতুন ব্যানার টেনেছি; কিন্তু খোঁজ রাখিনি-হারিয়ে যাওয়া মাছের জাত কি ফিরে এসেছে? পাখির সংখ্যা কি বেড়েছে? বনাঞ্চল কি পুনরুদ্ধার হয়েছে? জলজ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য কি ফিরেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ দারিদ্র্য এবং বিকল্প জীবিকার অভাব। ১৯৯৬ সালে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি বন্ধ হওয়ার পর হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। জীবিকার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে হাওর। মাছ ধরা, গাছ কাটা, পাখি শিকারসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এরপর জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়েনি।

ফলে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ক্রমশ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাস্তবতা হলো, যে মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়, তার কাছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ভাষণ খুব বেশি অর্থ বহন করে না। 

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে আলাদা করে দেখার প্রবণতাই টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

প্রকৃতিকে রক্ষা করতে চাইলে প্রথমে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষকে বাঁচাতে হবে।

সেজন্য এবারের বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কর্মসংস্থানভিত্তিক সংরক্ষণ। হাওরকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ, উচ্চমূল্যের ফসল, নারীদের বিকল্প আয় এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে সংরক্ষণকে অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

কারণ সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে প্রকৃতি রক্ষার অংশীদার করে তোলা।

এখানে রামসার কনভেনশনের ‘ওয়াইজ ইউজ’ বা বিচক্ষণ ব্যবহারের দর্শন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এই দর্শন প্রকৃতিকে তালাবদ্ধ করে রাখার কথা বলে না, আবার অবাধ ব্যবহারেরও অনুমতি দেয় না। বরং এমন একটি ভারসাম্যের কথা বলে, যেখানে জলাভূমির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকবে, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থও সুরক্ষিত হবে।

কিন্তু বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকটগুলোর একটি হলো নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন।

প্রতিনিয়ত টাঙ্গুয়ার হাওরে বাড়ছে দর্শনার্থী

পর্যটন মৌসুমে শত শত নৌযান ও হাউসবোট হাওরে প্রবেশ করে। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, ডিজেল দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, করচবনের ওপর চাপ এবং জলজ উদ্ভিদের ক্ষয়-সব মিলিয়ে বাস্তুতন্ত্রের ওপর বাড়ছে মানবসৃষ্ট চাপ। একটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল রামসার সাইটে প্রতিদিন শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌকার চলাচল, শব্দদূষণ এবং বর্জ্যের স্তূপ কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।

টাঙ্গুয়ার হাওর কোনো বিনোদন পার্ক নয়, এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সুতরাং এখানে বাণিজ্যিক পর্যটনকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। পরিবেশগত বহনক্ষমতা নির্ধারণ, নৌযান নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ হ্রাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।

অন্যদিকে টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকটের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সীমানার বাইরেও নিহিত। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে পাহাড় কাটা, কয়লা ও চুনাপাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে এই হাওরে এসে পড়ছে। বিপুল পরিমাণ বালু-পাথর ও পলি নদী, খাল ও বিল ভরাট করছে। জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পুরো হাওর ব্যবস্থার প্রাকৃতিক চরিত্র।

নষ্ট হচ্ছে হাওর পাড়ের গাছপালা

প্রকৃতি রাষ্ট্রীয় সীমারেখা মানে না। মেঘালয়ের পাহাড়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তার রক্তক্ষরণ এসে পড়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে। তাই এই সংকটকে কেবল স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পরিবেশ কূটনীতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতারও প্রশ্ন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো জীববৈচিত্র্যের দ্রুত অবক্ষয়। যে হাওর একসময় লাখ লাখ পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয় ছিল, সেখানে আজ পাখির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বহু দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। বনাঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে।

বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মনির্ভরতা। মাছ, পাখি, উদ্ভিদ, পানি এবং মানুষ সবাই একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোর একটি অংশ ছিঁড়ে গেলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন সেই সুতো একের পর এক ছিঁড়ে যাচ্ছে।

তাই এখন প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক সাময়িক ব্যবস্থাপনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী জবাবদিহিতা, স্থানীয় জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। একই সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য একটি স্বতন্ত্র, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

টাঙ্গুয়ার হাওরের গল্প মূলত একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কোনো জলাভূমিকে রক্ষা করে না; রক্ষা করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা।

আজ টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমিকে রক্ষা করা নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত বিবেককে রক্ষা করা। কারণ কোনো রাষ্ট্র যখন তার সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন শেষ পর্যন্ত সে নিজের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বরাদ্দ তাই কেবল আরেকটি প্রকল্পের সূচনা হবে কি না, নাকি টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় নতুন দর্শন, জবাবদিহিতা ও বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করবে, সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই জলাভূমির ভবিষ্যৎ।

টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাজেটের অঙ্ক নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা