কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি
মানবজাতি আজ ইতিহাসের এক অসাধারণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সন্ধিক্ষণ বারবার আসে না। পঞ্চদশ শতাব্দীর নবজাগরণ, অষ্টাদশ শতাব্দীর আলোকায়ন, ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব কিংবা বিংশ শতাব্দীর পরমাণু যুগের মতোই একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক মানবসভ্যতার গতিপথকে নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ-সবকিছু মিলিয়ে আমরা এক নতুন বিশ্বের জন্ম প্রত্যক্ষ করছি।
এই নতুন বিশ্বকে বুঝতে হলে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার নদীসভ্যতা, মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ, উপসাগরীয় অঞ্চলের মরূদ্যান, ইউরোপের আলোকায়ন, উত্তর আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তি, দক্ষিণ আমেরিকার সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তি এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রযুক্তিগত উত্থানকে একই বৌদ্ধিক মানচিত্রে দেখতে হবে।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আর্নল্ড জে. টয়েনবি একবার লিখেছিলেন, “সভ্যতাগুলো হত্যা হয়ে নয়, আত্মবিনাশের মাধ্যমে ধ্বংস হয়”।
তার এই পর্যবেক্ষণ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ বাইরের কোনো শত্রু নয়, বরং বৈষম্য, অজ্ঞতা, অসহিষ্ণুতা, পরিবেশ ধ্বংস এবং নেতৃত্বের সংকট।
দক্ষিণ এশিয়া মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন জ্ঞান কেন্দ্র। এখানে বুদ্ধের করুণা, সম্রাট অশোকের নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা, নালন্দার জ্ঞানচর্চা, সুফিবাদের মানবতাবাদ এবং রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার দর্শন একই ঐতিহ্যের ধারক।
কিন্তু এই অঞ্চল এখনও দারিদ্র্য, জলবায়ু ঝুঁকি, অসমতা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গে সংগ্রাম করছে। তবুও বিশ্বের বৃহত্তম যুবশক্তি, দ্রুত সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়াকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
মধ্য এশিয়া আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভূগোল কখনো স্থির নয়, এটি ইতিহাসকে চালিত করে। সামরকন্দ, বুখারা ও খিভা একসময় যেমন জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের মিলনস্থল ছিল, তেমনি আজও নতুন যোগাযোগ করিডোর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে। ইতিহাস যেন নতুন রূপে ফিরে আসছে।
উপসাগরীয় অঞ্চল দেখিয়েছে কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে রূপান্তর করা যায়। তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, গবেষণা, পর্যটন, মহাকাশ কর্মসূচি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে তাদের অগ্রযাত্রা বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-যে জাতি ভবিষ্যৎকে আগে দেখতে পারে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তারই হয়।
ইন্দোচীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আমাদের শেখায় যে সভ্যতার শক্তি বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। ভারতীয়, চীনা, আরব এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ইঞ্জিনে পরিণত করেছে। বৈচিত্র্য এখানে দুর্বলতা নয় বরং শক্তির উৎস।
ইউরোপ আধুনিকতার জন্মভূমি। নবজাগরণ মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছে, আলোকায়ন যুক্তির শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং শিল্পবিপ্লব উৎপাদন ও অর্থনীতির ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান সম্ভবত এই শিক্ষা, যে যুদ্ধের চেয়ে সহযোগিতা অধিক শক্তিশালী এবং বিভাজনের চেয়ে সংহতি অধিক টেকসই।
উত্তর আমেরিকা উদ্ভাবনের প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রে পরিণত করেছে। তবে একই সঙ্গে এটি আমাদের দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি সামাজিক সংহতি, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মানবসভ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ বহন করে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বহু রাষ্ট্র উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর কারণ শুধু অর্থনীতিতে নয় বরং প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। উন্নয়নের জন্য সম্পদ প্রয়োজন, কিন্তু সম্পদের চেয়েও বেশি প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। বিশ্বের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র ধীরে ধীরে আটলান্টিক উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সমুদ্রবাণিজ্য এবং উন্নত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে এই অঞ্চলের হাতে নির্ধারিত হবে।
তবে কেবল অর্থনীতি দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না, ক্ষমতার প্রকৃতিও বুঝতে হয়।
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন যে আধিপত্য কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ধারণা, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন জোসেফ নাই। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হবে ‘নরম শক্তি’ যে শক্তি মানুষকে বাধ্য না করে আকৃষ্ট করে, ভয় দেখিয়ে নয়, অনুপ্রাণিত করে নেতৃত্ব দেয়।
অন্যদিকে এডওয়ার্ড সাঈদ আমাদের সতর্ক করেছেন যে জ্ঞান ও ভাষা কখনো পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। যে পক্ষ অন্যকে সংজ্ঞায়িত করে, সে-ই প্রায়শই ক্ষমতার কাঠামো নির্মাণ করে। আর মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন যে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও তা সক্রিয়ভাবে কাজ করে।
বিশ্বব্যবস্থার অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন তার বিখ্যাত ‘বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্বে’বিশ্বকে কেন্দ্র, প্রান্ত এবং অর্ধ-প্রান্তে বিভক্ত করেছিলেন। তার বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন শুধু অভ্যন্তরীণ নীতির ফল নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’ তত্ত্বে যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতের সংঘাত আদর্শগত নয়, বরং সভ্যতাগত হতে পারে। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়-সভ্যতাগুলো কি সংঘর্ষে যাবে, নাকি সংলাপে?
আমার বিশ্বাস, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সংঘর্ষ নয় বরং সভ্যতার সংলাপ। কারণ বর্তমান বিশ্বের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো-জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্যসংকট, অভিবাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা-কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এসব সমস্যা বৈশ্বিক, সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
বর্তমানে আমরা প্রবেশ করছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম গণনা প্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি, রোবট প্রযুক্তি এবং মহাকাশবিজ্ঞান মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে বদলে দেবে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যদি নৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা উন্নয়নের পরিবর্তে নতুন বৈষম্য, নজরদারি এবং সামাজিক বিভাজনও সৃষ্টি করতে পারে।
এখানেই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়, আমরা কি আরও ক্ষমতাশালী পৃথিবী চাই, নাকি আরও মানবিক পৃথিবী?
আলবার্ট আইনস্টাইন একবার সতর্ক করে বলেছিলেন, “আমাদের প্রযুক্তি আমাদের মানবিকতাকে অতিক্রম করেছে-এটি ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে”।
তার এই সতর্কবাণী আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সত্য।
অন্যদিকে সমকালীন চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়া হারারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হবে তথ্য, জ্ঞান এবং মানবমনের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তাই ভবিষ্যতের সংগ্রাম কেবল ভূখণ্ড বা সম্পদের জন্য নয়; বরং ধারণা, তথ্য এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও সংঘটিত হবে।
এই বাস্তবতায় নতুন বিশ্বের জন্য পাঁচটি ভিত্তি অপরিহার্য।
ইতিহাসের দীর্ঘ প্রবাহ আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। রোম, বাগদাদ, কনস্টান্টিনোপল, লন্ডন কিংবা ওয়াশিংটন-ক্ষমতার কেন্দ্র বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু যে মূল্যবোধগুলো মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে সেগুলো অপরিবর্তিত: জ্ঞান, ন্যায়বিচার, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা এবং মানবিক মর্যাদা।
অতএব, একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত নেতৃত্ব অস্ত্রের আধিপত্যে নয়, চিন্তার উৎকর্ষে। সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, প্রজ্ঞার গভীরতায়। প্রযুক্তির শক্তিতে নয়, মানবিকতার বিস্তারে নিহিত।
কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের বিচারশালায় কোনো জাতির প্রকৃত মহত্ত্ব তার সামরিক শক্তি দ্বারা নয়, তার সভ্যতার মান, তার জ্ঞানের গভীরতা এবং মানবকল্যাণে তার অবদান দ্বারা নির্ধারিত হয়।
আর সেই কারণেই ভবিষ্যতের পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হবে না কোনো সাম্রাজ্য, কোনো অস্ত্র কিংবা কোনো প্রযুক্তি ভবিষ্যতের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হবে আলোকিত মানবচেতনা।
যে জাতি জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞা, ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং উন্নতির সঙ্গে মানবিকতাকে সমন্বিত করতে পারবে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তারই হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি)