বিআরটিসি বাস। ফাইল ছবি
বিআরটিসিÑ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন একটি ব্যবসায়িক সেবা প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা-পূর্ব ইপিআরটিসিরই পরিবর্তিত নাম এটি।
সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করা। যেখানে বেসরকারি কোম্পানিগুলো কেবলমাত্র তাদের মুনাফার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়, সেখানে সরকারি মালিকানার এ প্রতিষ্ঠান মুনাফার পাশাপাশি নাগরিক সেবাও নিশ্চিত করবে। এজন্য বিআরটিসির পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ভর্তুকিও দিতে হয়। তা সত্ত্বেও সংস্থাটি অদ্যাবধি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং নাগরিক সেবার পরিবর্তে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, ড্রাইভার, সুপারভাইজার, হেলপার মিলে যে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, তাতে সংস্থাটি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। রোগাক্রান্ত বিআরটিসি এখন রীতিমতো ধুঁকছে।
বিআরটিসির এই ধুঁকে ধঁকে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আংশিক চিত্র ফুটে উঠেছে গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশের এক বিশেষ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, যাত্রীসেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত সরকারি এই সড়ক পরিবহন সংস্থাটি এখন জনগণের কাছে দুর্ভোগের প্রতিবিম্ব হিসেবে পরিগণিত।
সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটিসি এখন নাগরিক সেবা দেওয়ার পরিবর্তে পুরোদমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যস্ত। সে ব্যবসা যদি সংস্থাটির স্বার্থে হতো, তাহলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু এ ব্যবসায়িক কার্যক্রম মূলত উল্লিখিতদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণাধীন ও তাদেরই স্বার্থে পরিচালিত।
বলা যায়, সংস্থাটি এখন হরিলুটের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। বিগত আমলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির লোকজন সংস্থাটিকে লুটেপুটে খেয়েছে। এখনও সে ধারা অব্যাহত। ফলে ওই সিন্ডিকেটই হয়ে উঠেছে সর্বেসর্বা। চেয়ারম্যান, জিএম, ডিজিএম কিংবা ডিপো ম্যানেজার সবাইকে ওই সিন্ডিকেটের কথামতো চলতে হয়। তাদের সদয় অনুমতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
দীর্ঘদিন ধরেই বিআরটিসির অধিকাংশ বাস বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে জনগণ অর্থাৎ সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি বাস সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। রাজধানীতে সকাল-বিকাল যেসব লাল রঙের বাস রাস্তায় দেখা যায়, সেগুলো প্রায় সবই ভাড়ায় চালিত। কালেভদ্রে দু-চারটি বাসকে দেখা যায় বিভিন্ন রুটে সাধারণ যাত্রী পরিবহনে। এসব বাস আবার বেশিরভাগই লক্কড় মার্কা, চলাচলের অনুপযোগী। জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে রাস্তায় নামানো হয় এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে সেগুলোর সময় লাগে প্রায় দ্বিগুণ। ফলে সাধারণ যাত্রীরা পারতপক্ষে বিআরটিসি বাসের ধারেকাছে ঘেঁষে না। বিভিন্ন সংস্থার কাছে ভাড়া দেওয়ার পর বাকি বাস চালক ও হেলপারদের কাছে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে চুক্তিতে ভাড়া দেওয়া হয়। এর ফলে বাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চলে যায় ড্রাইভার-হেলপারদের হাতে। এখানেও রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ড্রাইভার-হেলপারদের সিন্ডিকেট। তারা তাদের ইচ্ছামাফিক গাড়ি চালান এবং রাজস্ব জমা দেন। ফলে সংস্থাটি লাভের মুখ দেখছে না।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাস্তায় গণপরিবহন হিসেবে বিআরটিসির বাস কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বিকল বাস মেরামত করে সচল না করা। সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিরা পুরনো বাস সচল করার পরিবর্তে নতুন বাস আমদানিতে অধিক আগ্রহী। এই আগ্রহের পেছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। বিদেশ সফর থেকে শুরু করে সরবরাহকারী কোম্পানি কর্তৃক প্রদেয় কমিশন হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের তহবিল স্ফীত করা অন্যতম। একটি বিষয় সচেতন ব্যক্তিদের নজর এড়ায়নি। হাল আমলের বিআরটিসির বাসগুলো স্বল্পায়ুর হয়ে থাকে। ঝকঝকে বাস রাস্তায় নামানোর পর বছরখানেক যেতে না যেতেই এমন হতশ্রী দশায় উপনীত হয়, যেন ওগুলোকে প্রভুহীন পথের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করা অসমীচীন হবে না।
লক্ষণীয় হলো, এখন সব বাস আমদানি করা হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। টাটা ও অশোক লেল্যান্ড কোম্পানির এসব বাস এতটাই হালকাভাবে তৈরি যে, এগুলোর আয়ুষ্কাল হয় খুব কম। ফলে দেশের বিআরটিসি বাস ডিপোগুলোতে অকেজো বাসের ভিড় জমে উঠছে আর সরকারের গণপরিবহন প্রকল্প মুখথুবড়ে পড়ছে। একসময় দেশে বিআরটিসির বাস আমদানি হতো জাপান থেকে। গণচীনের তৈরি কিছু বাসও আগে এসেছে দেশে। সেসব বাস দেখতে যেমন চমৎকার, তেমনি ছিল টেকসই। পাঁচ-দশ বছরে বাসগুলোর কিছুই হতো না। একটি মিৎসুবিশি কিংবা ইসুজু বাস কুড়ি বছরেও পুরনো থাকত সচল। কিন্তু দাম বেশির অজুহাতে সেসব বাস আমদানি বাদ দিয়ে ভারতীয় নিম্নমানের বাস আমদানির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে লোকাল এজেন্ট বিধায় নিম্নমানের বাস গছিয়ে দিতে ভারতীয় কোম্পানিকে বেগ পেতে হয়নি। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, ঢাকা এবং বিভিন্ন স্থানে বিআরটিসির বাস ডিপোগুলোতে যেসব অকেজো বাসের গায়ে মরচে ধরেছে, তার সবই ভারতীয় নিম্নমানের।
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এখন সময় এসেছে, রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন বহরে সংযোজনের জন্য অন্য কোনো দেশ থেকে উন্নত মানের বাস আমদানির। সরকার এ বিষয়ে যথাযথ নজর দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের তছরুপ বন্ধ হবে, অন্যদিকে ধ্বংসের হাত থেকে বিআরটিসি রক্ষা পাবে।