× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নাম-বদনামের কড়চা

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

মহিউদ্দিন খান মোহন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন খান মোহন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘নামের বড়াই করো নাকো, নাম দিয়ে কী হয়/নামের মাঝে পাবে নাকো সবার পরিচয়।’ ‍১৯৬০-এর দশকের একটি জনপ্রিয় গান। কিংবদন্তি গীতিকার ও সুরকার সত্য সাহার অমর এ সৃষ্টি ছোটদের ছড়াগান হলেও এর রয়েছে গূঢ় মর্মার্থ।
মানুষের জীবনে নাম একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ হলেও সেটাই সবকিছু নয়। যদিও মানুষের পরিচয়ের ক্ষেত্রে নাম গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার আসল পরিচয় কর্মে ও মনুষ্যত্বে।

তাছাড়া নামের সঙ্গে সঙ্গতিহীন পরিচয়ের মানুষের অভাব নেই। যেমন যে লোকটি ভিক্ষা করে জীবন চালায়, তার নাম হয়তো ‘বাদশাহ মিয়া’। আবার কোটিপতির নামের সামনে বা পেছনে ফকির শব্দের সন্নিবেশও বিরল নয়। আমাদের দেশের একটি বড় বাণিজ্যিক গ্রুপের নাম ‘ফকির গ্রুপ’। শুনলে প্রথম ধাক্কায় মনে হতে পারে, এটা বোধকরি ফকির-মিসকিনদের একটি গ্রুপ। কার্যত তা নয়। ফকির গ্রুপ পোশাক খাতের একটি বড়সড় কোম্পানি। আমাদের পার্শ্ববর্তী উপজেলা লৌহজংয়ের পয়সা নামক গ্রামে একজন বিখ্যাত ধনীব্যক্তি ছিলেন, ‘গরিব হোসেন খাঁ’ নামে। নামের শুরুতে ‘গরিব’ শব্দাট লেপ্টে থাকলেও তিনি গরিব ছিলেন না। অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন রাজধানীর ইসলামপুরের এই বস্ত্র ব্যবসায়ী। আবার দেখা যায়, যার নাম আমানত মিয়া, সে অপরের সম্পদ ‘খেয়ানত’ অর্থাৎ আত্মসাৎ করে বসে আছে। একজনকে জানি, যার নামের মধ্যে একটা পবিত্র ভাব রয়েছে। অথচ সে ব্যক্তি মনিবের বিপদের দিনে তার জিম্মায় থাকা অর্থ ও অস্থাবর সম্পদ আত্মসাৎ করে বিত্তশালী হয়েছে। বর্তমানে সে একজন কেউকেটা।
চঞ্চল নামের ছেলেটিকে যখন দেখা যায় দুনিয়ার অসলতাকে সর্বাঙ্গে ধারণ করে শুয়ে-বসে দিন কাটাতে, তখন ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ প্রবাদটিকে যথার্থ মনে না হওয়ার কারণ থাকে না। দেখতে অসুন্দর মেয়েটিকে যখন ‘বিউটি’ নামে ডাকতে হয়, তখন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায়কেই মনে পড়ে। এক কৌতুক নকশায় ভানু তার বৌকে বলছিলেন, ‘তোমার দুইটা ট্যারা চোখ, আর সারা জীবন তোমারে আমার ‘সুনয়িনী’ কইয়া ডাকতে হইতাছে।’ নামের সঙ্গে মানুষের এই বৈপরীত্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না। সুতরাং এখানেই ক্ষ্যামা দেওয়া ভালো।

মানুষ নামের কাঙাল কথাটি কিন্তু মিথ্যে নয়। সব মানুষই চায়, তাকে সবাই ‘এক নামে’ চিনুক। নিজেকে জাহির করার বা নিজের পরিচিতি ছড়িয়ে দিতে মানুষ নানান কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। কেউ ভালো কাজ করে নাম কিনতে চায়। আবার খারাপ কাজের কারণেও কেউ কেউ জনপরিচিতি অর্জন করে। এছাড়া নিজের নামকে চিরস্থায়ী করার মানসে বিত্তশালী অনেকে মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, এতিমখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় অর্থ ব্যয় করে থাকে। কেউ কেউ নেপথ্যে থেকে এসব জনহিতকর কাজ করলেও অধিকাংশ ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা অর্থদাতা হিসেবে নিজের নাম সাইনবোর্ডে কিম্বা উদ্বোধনী ফলকের শ্বেতপাথরে কালো অক্ষরে উৎকীর্ণ করার শর্ত দিয়ে থাকে। অনেকে আবার আরেকটু এগিয়ে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন নিজের নামে। 

অতীতের পরিচয় মুছে নতুন নামে পরিচিত হতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়ার গল্পও প্রচলিত আছে। যারা কাপড় বুনে, তাদেরকে তাঁতি বা জোলা বলা হয়। আমাদের সমাজে তাঁতিদের নিচু শ্রেণির মনে করা হয়; যদিও এটা মানবিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, আল্লাহর সষ্টি মানুষের মধ্যে কোনো শ্রেণিভেদ নেই। তারপরও মানুষ এই ভেদাভেদ তৈরি করে নিয়েছে। তো এক তাঁতি ব্যবসা করে অনেক টাকা-পয়সার মালিক হওয়ার পর নিজেকে ‘মিয়া সাহেব’ বলে প্রচার করার খায়েশে এক মহাভোজের আয়োজন করল। দশ গ্রামের মানুষকে দাওয়াত করে ভালো ভালো খাবার খওয়ালো। দাওয়াত খেয়ে মানুষ যখন ফিরে যাচ্ছে, তখন সে রাস্তার পাশে এক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল কে কী মন্তব্য করে তা শোনার জন্য। কিন্তু সে যা শ্রবণ করলো, তাতে তার বেহুঁশ হওয়ার অবস্থা। সে শুনতে পেল, ভরপেট খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ফিরে যাবার পথে দাওয়াতি মেহমানরা মন্তব্য করছেÑ ‘হালায় জোলা হইলে কী হইব, খাওয়াছে ভালোই।’ লোকটির মিয়া সাহেব নাম কেনার খায়েশ চিরতরে হারিয়ে গেল।

নাম নিয়ে বহু তুঘলকি কাণ্ড আমাদের দেশে ঘটতে দেখা যায়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম বদল হওয়া এখন আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক কারণে এমন নাম বদল সঙ্গত হলেও রাজনৈতিক কারণে হলে তা মেনে নেওয়া যায় না। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অনেক স্থাপনার নাম বদল হয়েছে। যেমন ঢাকার জিন্নাহ অ্যাভিনিউর নাম হয়েছে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, আইয়ুবনগরের নাম হয়েছে শেরেবাংলা নগর, আইয়ুব গেটের নাম হয়েছে আসাদ গেট, কায়েদে আযম কলেজের নাম হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মহাখালীস্থ জিন্নাহ কলেজের নাম হয়েছে তিতুমীর কলেজ ইত্যাদি। তারও আগে পাকিস্তান আমলেই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ১১ জন সিপাহিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার স্মৃতিবিজড়িত ভিক্টোরিয়া পার্কের নামকরণ করা হয় ‘বাহাদুর শাহ্ পার্ক।’ এসব নাম পরিবর্তনের সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব জড়িত। কিন্তু কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা কিংবা সড়কের নাম বদলের সংস্কৃতি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক দৈন্য ও হীনম্মন্যতারই পরিচায়ক।

আওয়ামী লীগ, তথা শেখ হাসিনার শাসনামলে এই নাম বদলের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে প্রতিবার। যখনই দলটি সরকারের এসেছে, তখনই বিভিন্ন স্থাপনা থেকে বরেণ্য ব্যক্তিদের নাম মুছে ফেলার সভ্যতাবিবর্জিত কাজে লিপ্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই নাম বদল-প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান এবং মরহুমা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনা বদলে ফেলেন দেশের প্রধান বিমানবন্দর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম। চালাকি করে বিমানবন্দরটির নামকরণ করেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যেহেতু আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.) এদেশের মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়, তাই ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে যাতে নাম পরিবর্তন করে জিয়াউর রহমানের নাম বসাতে না পারে, সেজন্য এই বন্দোবস্ত। ক্ষমতার শেষ মেয়াদে এসে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা নাম পরিবর্তনের রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন দুরারোগ্য ব্যাধির ন্যায়। যেসব স্থানে জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার নাম ছিল, নির্দয়ের মতো সেগুলো মুছে ফেলে নিজের স্বজন-পরিজনদের নাম বসিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, মা ফজিলাতুননেসা মুজিব, ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, বোন রেহানা, ভাইয়ের স্ত্রী সুলতানা কামালসহ পরিবার ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীর প্রায় সবার নামেই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রতিষ্ঠান-স্থাপনার নাম রেখেছিলেন। একটি গল্প সে সময় বেশ প্রচলিত হয়েছিলÑ এক বিদেশি বন্ধুকে দাওয়াত দিয়ে এনেছে এক বাংলাদেশি যুবক। উদ্দেশ্য নিজের দেশটা বিদেশি বন্ধুকে ঘুরেফিরে দেখানো। তারা রওয়ানা হলো উত্তরাঞ্চলের দিকে। যমুনা সেতু দেখে বিদেশি বন্ধু বলল, ‘বাহ বেশ সুন্দর তো! কী নাম এটার?’ বাংলাদেশি যুবক বলল, বঙ্গবন্ধু সেতু। সেখান থেকে ফিরে আসার পথে তারা ঢুকল নভোথিয়েটারে। বিদেশি বন্ধু জিজ্ঞেস করল, এটার নাম কী? বাংলাদেশি যুবক বলল, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার। এরপর পিজি হাসপাতালের কাছে আসতেই যুবক বলল, এটা আমাদের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। বিদেশির প্রশ্নÑ এটার নাম? বাংলাদেশি বলল, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা স্টেডিয়ামের কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই যুবক বলল, এটা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। বিস্মিত বিদেশি বন্ধু বলল, আলাদা এক নাম না রেখে পুরো দেশটার নাম তোরা ‘বঙ্গবন্ধুল্যান্ড’ রাখেন না কেন? বাংলাদেশি যুবক লা-জওয়াব। একজন মাত্র নেতার নামে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের আনাচেকানাচে এত প্রতিষ্ঠানের নামকরণের দৃষ্টান্ত বোধকরি পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। বলা নিষ্প্রয়োজন, সেসব নামের অধিকাংশ এক ঝড়ো হাওয়ায় উড়ে গেছে।
 
আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাদের বিদায় ঘটেছে। শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে নয়, রাজনীতির মঞ্চ থেকেও। তবে তাদের প্রবর্তিত নামকরণের ভাইরাস বর্তমান সরকারের কাউকে কাউকে সংক্রমিত করেছে। আর এক্ষেত্রে মশহুর হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। অভিযোগ উঠেছে, বগুড়া-০২ আসনের শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভেঙে সম্প্রতি নতুন সৃষ্ট উপজেলা মোকামতলার নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ করেছিলেন নিজের বাড়ি ও দুই পুত্রের নামে। তার পৈতৃক বাড়ি ‘মীরবাড়ি’র নামে মীরবাড়ি ইউনিয়ন, পুত্রদ্বয় মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্তের নামে দুটি ইউনিয়ন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং জাতীয় সংসদে সমালোচনার ঝড় উঠলে প্রতিমন্ত্রী প্রথমে ‘আলৌকিক’ বলে তা সামাল দিতে চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয় নি। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রস্তাবিত ওইসব নাম পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানা গেছে। 
সমালোচনার মুখে নাম বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সরকারের ক্ষতি যেটুকু হওয়ার ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছে। লোকজন বলছে, আওয়ামী লীগের ভূত এখন বিএনপির কাঁধেও সওয়ার হয়েছে। এটা হতেই পারে। ভূতের কাজই হলো কারও না কারও কাঁধে সওয়ার হওয়া। তবে সে ভূত তাড়াতে যে শর্ষে দরকার, তা মজুদ থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রমাণ হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে সেটা আছে। নানা অস্বস্তির মধ্যে স্বস্তির খবর আপাতত এটাই।


লেখক: মহিউদ্দিন খান মোহন (সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা