ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
কবি আল মুজাহিদী। ছবি: উইকিপিডিয়া
'মানুষ রচনা করে মানুষএ' -কথা কবি আল মুজাহিদীর। তিনি গতকাল শুক্রবার বেলা ১টা ৩০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ফলে পৃথিবীর যাত্রাপথ তার শেষ হয়ে গেল।
যে অনন্তযাত্রায় তিনি এখন শামিল হলেন, সেখানে কী
আছে তা আমরা জানি না। আর সমস্ত অজানাই মানুষের শান্তি আর ভয়ের সৌরভে সিক্ত। সেই সিক্ততা
তো মানুষের কল্পনারই অংশ, যা দেখা যায় না, জানা যায় না।
আমরা আল মুজাহিদীকে
ডাকতাম মৃত্তিকার কবি হিসেবে। তিনি মাটিলগ্ন এক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কবি। কারণ তিনি ছিলেন
ঐতিহ্যবাদী, পরম্পরামুখী মানবিক বিশ্বের রাজনৈতিক কবি। রাজনীতিই ছিল তার প্রথম কবিতা।
মানুষের মন-পাঠ আর-মনন-পাঠ করে যারা মানুষের সেবা করতে চান, তাদের কর্ম সমাজের রাজনৈতিক
কর্মেরই অধীন। সেই রাজনৈতিক শিল্পযাত্রার সূচনাকাল থেকেই তিনি কবিতাযাত্রায় যোগ দেন।
তার মানে রাজনীতি আর কবিতা শিল্পের মধ্যে যে সংযোগ, তার ফসলই তো বর্ণময় কবিতা।
তিনি যখন লেখেন
‘যুদ্ধ কোনো মানবিক শব্দ নয়’ (যুদ্ধের সংস্কৃতি নেই) তখন আমাদের মনে পড়ে পাকিস্তানিদের
বর্বর যুদ্ধ, যারা ১৯৭১ সালে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুক্তির সেই যুদ্ধের একজন
সৈনিক আল মুজাহিদীর কলমেই তো এ-কথা উঠে আসবে।
মানবতা না থাকলে
মানুষ হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করতে পারি না আমরা। একাত্তর সালে আমরা ইয়াহিয়াকে মানুষ
হিসেবে চিনতে পারিনি। জন্তুর প্রতিচ্ছবিতে তাকে চেনা গেছে।
যুদ্ধ শব্দটি আমাদের বিভীষিকাময় এক ভিয়েতনামের রক্তাক্ত দেশকে দেখায়, যেখানে আমেরিকা তার কালো নগ্নহাতে দখল করেছিল। কিন্তু মানুষ যখন জেগে ওঠে তখন ওই রকম কালো নোংরা হাতের থাকা বন্দিরা তাদের উল্টে দিতে ভয় পায় না। আমরা কি অতি সম্প্রতি দেখতে পাইনি মার্কিনিদের ইরানে উদগ্র পরাজয়, ভূরাজনীতিগতভাবে মার্কিনি-ইসরায়েলি হামলায় মানুষ নিহত হয়েছে। ওই যুদ্ধে মানুষের রক্তে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ডুবে গেছে, কিন্তু হরমুজ প্রণালী দখল করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে মানুষের কাছে হিংস্রতারই পরাজয় হয়েছে।
এই সব যুদ্ধের
বিভীষিকা আমার চেতনায় এসে ধাক্কা দিচ্ছে আল মুজাহিদীর মৃত্যুর পর। যুদ্ধ যে কত ভয়াবহ
হতে পারে তার নগ্নতা মানুষ প্রতিদিনই দেখছে, ভোগ করছে তার নৃশংসতা। আল মুজাহিদী যেন
আগামীকে তুলে এনেছিলেন তার যুদ্ধ বিষয়ক এই কবিতায়। তার সমগ্র চেতনায় মানুষের প্রতি
যে দায় ও দায়িত্ব তা-ই প্রকাশিত হয়েছে।
‘কাঁদো হিরোশিমা
কাঁদো নাগাসাকি’ আল মুজাহিদীর এই কবিতার বইটি বেরিয়েছে ফাল্গুন, ১৪০৬ সালের বইমেলায়।
আমরা তাকে চিনি ফেব্রুয়ারি মাস হিসেবে। নাম দেখে মনে হতে পারে তিনি বোধহয় জাপানি হিরোশিমা
নাগাসাকির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিমালয়সমান নিষ্ঠুরতার কবিতা রচনা করেছেন। আসলে
কি তাই? না, আসলে তিনি কবিতা রচনা করেছেন ওইসব নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে যেখানে মানুষ বন্দি,
নির্য়াতিত, নিপীড়িত ও হত্যাযজ্ঞের শিকার।
তিনি লিখেছেন ‘হিরোশিমা, এতো অন্ধকার করে রেখেছিলে আমার গরাদ, কারাগার।/একটু প্রতীক্ষা করো। আর বার বার কাঁদো/অনুভূতি উজাড় করে দিয়ে। আমি/আবারও ফিরে আসবো তোমার উঠোনে। লোহার শেকড় ছিঁড়ে ফেলে ভোরের/টোপর পরা পাখির মতো। অরণ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে।
‘লোহার শেকড় ছিঁড়ে
ফেলে’ কবিতার পিঙ্ক্তিগুলো আমাদের কী মেসেজ দেয়? তিনি একজন বন্দি মানুষ। অন্ধকারে
বন্দি, জীবন ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, জীবনযাত্রার মহাবিশ্ব থেকে তিনি বাইরে। তার
এই দৃঢ় উচ্চারণ আমি ফিরে আসবো তোমার উঠোনে। মানে তিনি আবারও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কারণে
বন্দি হবেন। আবারও ফিরবেন এই কারাগারে।
একজন যোদ্ধাকেই
এখানে পাই আমি আল মুজাহিদীর এই কবিতার পঙ্ক্তিতে।
তিনি যখন লেখেন
‘এই ধ্বংস আর ভস্মরাশি থেকে আমি জেগে উঠি’ তখন মনে হয় তিনি যেন সেই ফিনিক্স পাখি, যে
নিজেকে পুড়িয়ে আবার সেই ছাইভস্ম থেকে পুনর্জন্ম নেয়। আল মুজাহিদীর এই কল্পনা প্রতিরোধযোদ্ধার
এক অমর আকাঙ্ক্ষা।
তার আকাঙ্ক্ষার
আরেক রূপ দেখা যাক…
‘দেখো, একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ
মৃত্তিকার অতল গহ্বর খুঁড়ে তুলে আনছে ফসিল/তোমাকে দাঁড় করিয়ে দেবে ঐ হাড়গোড়ের সামনে/বিচারের
কাঠগোড়ায়’ (আগত, অনাগত কাল শান্তিময় হোক)
আমরা ধরে নিতে
পারি সেই চরিত্রের লোকটিকে, যার অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। তিনি সাক্ষী দেবেন শতাব্দীর
শেষ সাক্ষী হিসেবে… সৃষ্টির সপক্ষে।
অর্থাৎ আল মুজাহিদী
জীবনের পক্ষে শেষ সাক্ষী হবেনÑ এটাই তার মর্মবিদারী উচ্চারণ।
২.
আল মুজাহিদীকে চিনতে হলে তার কবিতার ভেতরে হাঁটতে হবে। এই হাঁটা আক্ষরিক নয়; এই হাঁটা তার কবিতার ভেতরের রক্তমাংসের ভেতরে হেঁটে যাওয়া। তবে তাকে অবশ্যই আপাদমস্তক বুঝতে হলে পড়তে হবে তার কবিতার বই। সেখানে কেবল হিরোশিমা, নাগাসাকি নয়; পাওয়া যাবে তার চিন্তার সামগ্রিক নিখিল।
লেখক: ড. মাহবুব হাসান