গ্রফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচন দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভর্তুকি ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং আয়বৈষম্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) এক সেমিনারে উত্থাপিত তথ্য বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। সেমিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাজেট ২০২৬-২৭ : সংস্কারের সংকেত, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও বাস্তবায়নের ঝুঁকি’। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান এমএ রাজ্জাক।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার
নির্ধারিত ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনলে দারিদ্র্যের হার এক
ধাক্কায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসবে। আর যদি দেশের সকল নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা যায় তা হলে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশে
নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের
জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। নারী-পুরুষের অনুপাত ১০০:৯৬.৩ অর্থাৎ দেশে
পুরুষের তুলনায় নারী বেশি। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে নারীদের অংশগ্রহণ,
নারীদের ক্ষমতায়ন, নারীদের স্বাবলম্বী করার বিষয়ে নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা মনে
করিয়ে দিচ্ছে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে চরম
দারিদ্র্যে বাস করেন ৫.৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ দেশের ৫ ভাগের প্রায় ১ ভাগ মানুষ
দরিদ্র। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এই হার ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্ষেত্রে দেশের এত দরিদ্র
মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ আশার
আলোর মতো কাজ করবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ- শুক্রবার এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, নতুন বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে সাড়ে ১৪
হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া। এর মাধ্যমে ৪১ লাখ নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবার প্রতি মাসে
আড়াই হাজার টাকা করে পাবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্রদের মাঝে এই কার্ড বিতরণ করা
গেলে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমবে। আমরা মনে করি, কাগজে-কলমে এই কর্মসূচি
অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও এর মূল চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন করা। কেননা অতীতে
অনেক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বজনপ্রীতি ও অপচয়ের নজির রয়েছে।
ভুলে
গেলে চলবে না, দেশের দারিদ্র্যের হার এখনও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। যদিও বিগত
সময়ে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে, তবুও
মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে আয়
বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার আবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে
পড়ছে। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি ভর্তুকি কর্মসূচি নয়, বরং এটি সামাজিক
সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বলা প্রয়োজন,
বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কোটি
পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেল সরবরাহ করছে। বাজারে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও এসব পরিবারের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য প্রাপ্তি
তাদের ব্যয় কমাতে এবং প্রকৃত আয় সংরক্ষণে সহায়তা করছে।
র্যাপিডের
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের সহায়তা আরও বিস্তৃত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হলে দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে
কেবল কার্ড বিতরণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রকৃত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের
পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মমুক্ত তালিকা প্রণয়ন
এবং ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে উপকারভোগীদের নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। অনেক
সময় প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে যান, আবার তুলনামূলক সচ্ছল ব্যক্তিরা সুবিধাভোগীর
তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এই বৈষম্য দূর না হলে কর্মসূচির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ
হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নগদ
সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড
ব্যবস্থাকে যুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ শুধু খাদ্য-সহায়তার
মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও টেকসই উদ্যোগ।
এ
কথা সত্য, র্যাপিডের তথ্য ও বিশ্লেষণ নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ
বার্তা বহন করে। তাই দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফ্যামিলি
কার্ড কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা। আমরা মনে করি, ফ্যামিলি কার্ডের কার্যকর
বিস্তারই পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্য হ্রাসের
অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এ সুযোগ যথাযথভাবে
কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।