× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মোবাইল ফোনে বন্দি শৈশব

জাফরিন সুলতানা

প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৪ ঘণ্টা আগে

তিন শিশুর মোবাইল ফোনে গেম খেলার দৃশ্য।

তিন শিশুর মোবাইল ফোনে গেম খেলার দৃশ্য।

একবিংশ শতাব্দী প্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে পৃথিবী আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন কিংবা জ্ঞান অর্জন সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি।

যে বয়সে শিশুদের মাঠে দৌড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের পর্দার সামনে সময় কাটাচ্ছে। ফলে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বিকাশ হুমকির মুখে পড়ছে।

একসময় বিকাল মানেই ছিল শিশুদের খেলাধুলার উচ্ছ্বাস, গল্পের বই পড়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রাণবন্ত সময় কাটানো। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অনেক শিশুর দিন শুরু হয় মোবাইল ফোন দিয়ে এবং শেষও হয় মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে। অনলাইন গেম, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন অ্যাপ তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু যখন তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন সেটি আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়।

শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অভিভাবকদের ব্যস্ততা। আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ততায় অনেক বাবা-মা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না। ফলে সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে কিংবা কান্না থামাতে সহজ সমাধান হিসেবে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে শিশুরা মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাও এর একটি কারণ। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় মোবাইল ব্যবহার শিশুর মোবাইল আসক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।


অন্যদিকে অনলাইন গেম ও ভিডিও প্লাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে আকৃষ্ট রাখে। রঙিন গ্রাফিক্স, দ্রুত পরিবর্তিত দৃশ্য এবং বিভিন্ন পুরস্কারভিত্তিক গেম শিশুদের মস্তিষ্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ফলে তারা বারবার মোবাইল ব্যবহার করতে চায়। বন্ধুদের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন সমবয়সীদের অধিকাংশই মোবাইল ব্যবহার করে, তখন অন্য শিশুরাও সেটির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

মোবাইল আসক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং চোখে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার কারণে স্থূলতা, দুর্বল শারীরিক গঠন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক শিশু রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করে, যার ফলে তাদের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শিশুর বৃদ্ধি, মনোযোগ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও মোবাইল আসক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুদের মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তারা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না এবং সহজেই একঘেয়েমি অনুভব করে। বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিবর্তে তারা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, রাগ এবং আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়। মোবাইল কেড়ে নিলে শিশুদের অস্থিরতা বা বিরক্তি প্রকাশ করা আসক্তির একটি স্পষ্ট লক্ষণ।


মোবাইলে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে শিশুরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের সঙ্গে কম মেশে। ফলে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, সহমর্মিতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রেও মোবাইল আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সময়ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেম বা ভিডিওতে সময় নষ্ট করে। এর ফলে তাদের শিক্ষাগত অর্জন কমে যায় এবং শেখার আগ্রহ হ্রাস পায়। দ্রুত বিনোদনের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় তারা বই পড়া বা গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় এমন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন ঝুঁকিও শিশুদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অনুপযুক্ত কনটেন্ট, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার শিশুদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। অনেক সময় তারা না বুঝেই এমন তথ্য বা যোগাযোগের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তানকে ব্যস্ত রাখার সহজ মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যবহার না করে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। শিশুদের কথা শুনতে হবে, খেলাধুলায় উৎসাহ দিতে হবে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা এবং শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।


প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর সুফল অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত। শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে। কারণ একটি শিশুর সুস্থ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। আজকের শিশু আগামীর নেতৃত্ব দেবে, সমাজ গড়বে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই তাদের শৈশবকে মোবাইলের পর্দায় বন্দি না রেখে মুক্ত আকাশ, সবুজ মাঠ এবং মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সচেতন ও সম্ভাবনাময় আগামী প্রজন্ম।

 

লেখক: জাফরিন সুলতানা (শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়)

 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা