মিথিলা জসিম তন্নি
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
সংসার হলো এক অবিরাম স্রোতের নদী। তাতে বান ডাকে, ভাঙন লাগে, চর জাগে। আর সেই নদীর বুকে যে মানুষটি একলা বৈঠা বেয়ে পরিবার নামক তরীটিকে স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে নেন, তিনি আর কেউ ননÑ আমার বাবা, আপনার বাবা।
এই পৃথিবীর নীরব নায়ক তিনি। তিনি এক নিঃশব্দের মহাকাব্য। আত্মত্যাগের প্রতিমা। ভোরের আজানের আগেই যার ঘুম ভাঙে, তিনি বাবা। মাসের শেষ তারিখে মানিব্যাগের প্রতিটি নোট গুনে যে মানুষটি নিজের শপিংয়ের, ওষুধের টাকাটা বাদ দেনÑ তিনি বাবা। আমরা দেখিÑ ফ্রিজে মাছ, পড়ার টেবিলে নতুন বই, ঈদে নতুন জামা। কিন্তু দেখি না, এই ‘আছে’র পেছনে একজন মানুষের পরিশ্রম কত বিশাল। নিজের পায়ের ছেঁড়া স্যান্ডেলটা জোড়াতালি দিয়ে আরেকটা বছর চালিয়ে নেন, যেন মেয়ের কলেজের বেতনটা সময়মতো দেওয়া যায়। বন্ধুরা যখন কক্সবাজার ঘোরার প্ল্যান করে, তিনি চুপচাপ হিসাব কষেনÑ ছেলের ল্যাপটপটা না কিনলে তো তার অনলাইন ক্লাসটা হবে না। বাবার ডায়েরিতে নিজের জন্য কোনো পাতা বরাদ্দ নেই।
সব পাতাজুড়ে শুধু সন্তানের নাম, সন্তানের তারিখ, সন্তানের প্রয়োজন। মায়ের ত্যাগ চোখে দেখা যায়Ñ রান্নাঘরের আগুনে পোড়া হাত, সন্তানের জ্বরে ভেজা আঁচল। তাই মাকে নিয়ে সাহিত্য হয়, সিনেমা হয়। কিন্তু বাবার ত্যাগ? তা নীরবতার চাদরে মোড়া। কে জানে, অফিসে বসের অন্যায় ধমক হজম করে তিনি ওয়াশরুমে গিয়ে দু-সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন? কে জানে, বাজারে গিয়ে ইলিশের দাম শুনে চুপচাপ রুই মাছটা কিনে এনেছিলেন, যেন পকেটের টাকাটা বেঁচে যায়। কে জানে, মেলায় গিয়ে অন্য বাচ্চাদের হাতে খেলনা দেখে নিজের মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দোকানদারকে ফিসফিস করে বলেছিলেনÑ ভাই, একটু কম রাখা যায়? তার কান্না নেই, অভিযোগ নেই। তার ভালোবাসার বর্ণমালা মাত্র তিনটি শব্দেÑ লাগবে কিছু, মা? তার রাগের বহিঃপ্রকাশÑ রাতের ভাতটা একটু জোরে মাখিয়ে নেওয়ার মধ্যে। তার স্বপ্নের উচ্চারণÑ তোরা মানুষ হ, বাবা। সংসারে দুঃসময় আসবেই। চাকরি চলে যাবে, ব্যবসায় লোকসান হবে, বাবা-মা অসুস্থ হবেন। মা কাঁদলে সন্তানের বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু বাবা? তিনি কাঁদতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন, নৌকার মাঝি যদি হাল ছেড়ে দেয়, তবে সবাই অতলে তলিয়ে যাবে।
যতদিন সন্তান, ততদিন বাবা মানে এটিএম কার্ড। যতদিন ছাত্র, ততদিন বাবা মানে টাকার মেশিন। বাবাকে আমরা চিনি যখন নিজেরা বাবা হই। যেদিন প্রথমবার সন্তানের জ্বরে নিজের বুক কেঁপে ওঠে। যেদিন মাসের ২০ তারিখেই বেতনের টাকা ফুরিয়ে যায় তখন পুরনো অ্যালবাম খুলি। দেখি, বিশ বছরের সেই যুবক বাবাটার চোখে কত রঙিন স্বপ্ন ছিল। হিমালয় দেখার, সমুদ্র দেখার শখ ছিল, গিটার বাজানোর শখ ছিল। আজ সেই চোখে শুধু আমার মুখ। তিনি নিজের সব শখ, সব অসুস্থতা, সব ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে আমাকে একটা ভিত দিয়ে গেছেন। আমি আজ যে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নের সিঁড়িটা তিনি নিজের বুক পেতে বানিয়ে দিয়েছেন। মায়ের ঋণ যেমন ৯ মাস দশ দিন দিয়ে শোধ হয় না, বাবার ঋণও তেমন চল্লিশ বছরের পরিশ্রম দিয়েও শোধ হয় না। তবু চেষ্টা করা যায়। চেষ্টা করা যায়Ñ অফিস থেকে ফিরে তার পাশে বসে এক কাপ চা খাওয়ার। চেষ্টা করা যায়Ñ তার ছেঁড়া পাঞ্জাবিটা না দেখে তার কাঁচাপাকা চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দেওয়ার। বাবারা উপহার চান না। তারা চান সন্তানের সাথে দু-চার মিনিট সঙ্গ দেওয়ার। চান, সন্তান একবার তার গল্পটা শুনুকÑ কীভাবে তিনি শূন্য থেকে সংসারটা গড়েছিলেন। চান, শেষ বয়সে এসে সন্তানের কাঁধে মাথা রেখে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে।
বাবা নামক হালটা একদিন সত্যিই দুর্বল হয়ে যাবে। বৈঠা হাত থেকে পড়ে যাবে। নদীতে তখন আর জোয়ার থাকবে না। তার আগেই যদি আমরা বাবার নীরব আত্মত্যাগের মূল্য দিতে শিখি, তবে হয়তো তিনি শেষ বয়সে এসে একটু শান্তি পাবেন। আর একজন বাবার শান্তির চেয়ে সন্তানের জন্য বড় প্রাপ্তি আর কিছুই নেই। আর একটি বাবার হাসির চেয়ে পবিত্র দৃশ্য আর দ্বিতীয়টি নেই।
লেখক: মিথিলা জসিম তন্নি (শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা)