গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে চাঞ্চল্যকর ও ব্যাপক আলোচিত আর্থিক অপরাধÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ও হ্যাকিংয়ের ঘটনা। এই অপরাধটি সংঘটিত হয় ২০১৬ সালে।
তদন্তের নানা ধাপ পেরিয়ে প্রায় এক দশক পর এ ঘটনায় চার্জশিট প্রস্তুতের খবর যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাচ্ছে, তেমনি নতুন করে সামনে আনছে একটি মৌলিক প্রশ্নÑ এই বিপর্যয়ের দায় কার এবং অপরাধ কার কতটুকু? মামলার তদন্তে দেশি-বিদেশি অপরাধী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। আমরা মনে করি, শুধু অপরাধীদের শনাক্তই নয়, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য,
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক সুইফট ব্যবস্থার
দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার সরানো হয়।
এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনে চলে যায়, যার অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রাজধানীর মতিঝিল থানায় করা এই মামলার নথিপত্র, আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এরই মধ্যে ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট এবং খসড়া চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথির তথ্যানুযায়ী, এই চক্রের বিস্তার বাংলাদেশসহ বিশ্বের সাতটি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ডিজিটাল জালিয়াতি, হ্যাকিং, অর্থ চুরি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। আইনি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় করা ১৩ নম্বর মামলার অধীনে এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। মামলাটিতে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের (২০১৫ সালের সংশোধনীসহ) ৪ ধারা, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, রিজার্ভ চুরি ও অর্থ পাচারের এই অপরাধে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের হ্যাকার ও আর্থিক খাতের কর্মকর্তারা জড়িত। তালিকায় ফিলিপাইন, উত্তর কোরিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা, জাপান, ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক কর্মকর্তারাও হ্যাকিং চক্রের সদস্য। আন্তর্জাতিক চক্রের পাশাপাশি খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ জন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাকে এই মামলার চার্জে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ব্যাংকার আনিস এ খান, কেএম আবদুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এএফএম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম এবং মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদের নাম। তদন্তের নথিতে এদের বিরুদ্ধে সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, এফবিআই রিপোর্ট, সুইফট করেসপনডেন্স ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় নেওয়া জবানবন্দির সমন্বয়ে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল সিস্টেমে অনুপ্রবেশ ও হ্যাকিং প্রক্রিয়া সফল করতে কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভারতের চার নাগরিকের বিরুদ্ধে।
তদন্তের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অবহেলার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই ছিল। সেই জায়গায় যে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল, তা তদন্তে বারবার উঠে এসেছে। দায়িত্বে অবহেলা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা থাকলে তারও যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ার পর তথ্য গোপন ও সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমন একটি গুরুতর ঘটনা জনগণের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তথ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গা। সেখানে যদি এ ধরনের তছরুপ হয়, তাহলে তাকে বিশ্বসেরা ব্যাংক ডাকাতি বলা বোধ করি অত্যুক্তি হবে না।
এটা
শুধু অর্থ চুরির ঘটনা নয়, দেশের আর্থিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের ওপর বড় ধরনের আঘাত। এই চুরির সঙ্গে বিদেশি ব্যাংক,
ক্যাসিনো নেটওয়ার্ক ও আন্তঃদেশীয় অর্থ পাচারকারীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বহুবার
উঠে এসেছে। ফলে এটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক
আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতারও একটি উদাহরণ।
উদ্বেগজনক
বিষয় হলো, একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত শেষ করতে প্রায় দশ বছর সময় লেগে যাওয়া।
বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ দমনে ইতিবাচক বার্তা দেয় না; বরং দায়মুক্তির
সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। চার্জশিট যদি সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করার কার্যকর ভিত্তি না হয়, তাহলে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়বে। রিজার্ভ
চুরির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রয়োজন আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী
করা, দায়িত্বে অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্টদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। একটি অপরাধ বা
অবহেলার সঠিক বিচার নাহলে ভবিষ্যতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে। বিগত
সরকারের আমলে এই লোমহর্ষক চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে অপরাধীদের রেহাই দেওয়ার চেষ্টা
করা হয়েছে। বর্তমান জনগণের সরকার এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক অপরাধীদের
শাস্তি নিশ্চিত করবে, দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই।