নিরঞ্জন রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট পেশ করেছে। আকৃতি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
যেহেতু বিশাল বাজেট, তাই ঘাটতির পরিমাণ বড় হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এবারের বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬.৫% (গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট বা মোট দেশজ উৎপাদন)। সার্বিকভাবে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২৬%, যদি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা অর্জিত হয়। তা নাহলে এই ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।

অর্থনৈতিক মন্দা, বিনিয়োগে মন্থর গতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এর কোনোকিছুতেই বাজেট বরাদ্দে কোনো রকমফের হতে দেখা যায় না। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি তছনছ হয়ে গেছে। জিডিপি প্রায় তিন শতাংশের কাছে চলে এসেছে। কর্মসংস্থান তো সৃষ্টি হয়নি, উল্টো অসংখ্য মানুষ বেকার বা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। কয়েকটি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক ব্যবসা হয় ধ্বংস বা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করে দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনার জন্য যে ধরনের বিশেষ কিছু ফিসক্যাল পদক্ষেপ বাজেটে থাকা উচিত, তেমনটা আছে বলে মনে হয় না। শুধু তাই নয়, বছরের পর বছর বাজেট বাস্তবায়ন সন্তোষজনক না হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবছরই বৃহৎ আকৃতির ঘাটতি বাজেট হাতে নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত এমনটা দেখা যায়নি, আগের কয়েকটি বাজেট সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই পরবর্তী বাজেট একটু ছোট পরিসরে বাস্তবায়নযোগ্য করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর কারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মোট ঘাটতির ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। অবশিষ্ট ঘাটতির ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে ব্যাংকঋণ নিয়ে। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণে যে ঘাটতি দেখা দেবে, সেই অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার ব্যাখ্যা কখনোই বাজেটে থাকে না, এবারও নেই। বাজেটে যদিও বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা কঠিন। আবার প্রস্তাবিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সরকারকে অতিরিক্ত ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি কমতি দেখা দিয়েছে।
আগামী বছর যে অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হবে, তেমনটা আশা করা কঠিন। কেননা বিনিয়োগে গতি নেই, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সেভাবে নেই, আমদানি-রপ্তানিতে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে, যা খুব সহসা কেটে যাবেÑ এমনটা ভাবার কারণ নেই। আর এরকম অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই অর্জিত হয় না, বরং রাজস্ব আদায় অধিক পরিমাণে হ্রাস পায়। যদি তাই হয়, তা হলে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। মোটকথা, সব মিলিয়ে সরকারকে এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে কমপক্ষে দুই থেকে তিন লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
সরকারের
যেহেতু ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের উৎস খুব বেশি নেই, তাই ব্যাংকই হবে শেষ ভরসা। বাজেট বাস্তবায়ন
করতে সরকারকে যদি ব্যাংক থেকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ঋণ গ্রহণ করতে হয়, তাহলে দেশের
ব্যাংকিং খাত নিঃসন্দেহে এক মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়বে। প্রথমত, দেশের ব্যাংকিং খাতের
যে অবস্থা, তাতে ব্যাংকগুলোর সরকারকে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদানের সক্ষমতা আছে কি না,
সেটাই ভাবনার বিষয়। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণের ওপর যেহেতু সুদের হার অনেক বেশি, তাই সরকারকে
ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের জন্য উচ্চ হারে সুদ দিতে হবে এবং এর ফলে সরকারের সুদ বাবদ খরচের
পরিমাণ বেড়ে যাবে, যা আগামী বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যাংকঋণ নিয়ে বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমাদের দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ব্যাংকঋণ। ব্যাংক যদি সরকারকেই মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ফেলে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের মতো অর্থই তাদের হাতে থাকবে না। ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ বিঘ্ন হলে অর্থনীতিতে গতি আসবে না এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করেও বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। এর বাইরে অন্য একটি উৎসের কথা আলোচিত হয়ে থাকে, তা হচ্ছে টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি বাজেটের অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। তবে এই পদ্ধতি এখন পর্যন্ত সর্বজনস্বীকৃত কোনো পদ্ধতি নয়। অবশ্য আধুনিক মুদ্রানীতির প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত আমেরিকাভিত্তিক কয়েকজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এই তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন যে, সরকার চাইলে ঋণ না নিয়ে টাকা ছাপিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু এই ধারণাটা এখনও সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। কোনো কোনো উন্নত দেশ বিশেষ প্রয়োজনে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে বলে কথিত থাকলেও পদ্ধতিটি সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তা ছাড়া একসময় প্রতিষ্ঠা পেলেও অত্যাধুনিক মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হলে যে মানের অর্থনীতি হতে হয়, তার ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা। তাই আমাদের দেশে টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের পদক্ষেপটি হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, যার মারাত্মক খেসারত দিতে হবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে।
এ কারণেই সরকারের ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করতে হবে এমনভাবে, যাতে করে বেসরকারি বিনিয়োগ বিঘ্নিত না হয়। বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা প্রয়োজন। একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে বন্ড ইস্যু করে ঘাটতি বাজেটের অর্থের সংস্থান করা। এই পদ্ধতির বেশ কিছু সুবিধা আছে। প্রথমত, বন্ড ইস্যু করে ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর কোনোরকম বাড়তি চাপ পড়বে না এবং বেসরকারি বিনিয়োগে বিঘ্ন ঘটবে না। দ্বিতীয়ত, বন্ডের ওপর সুদের হারে তুলনামূলক কম হওয়ায় সরকারকে ঋণের সুদ বাবদ কম বরাদ্দ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, বন্ড সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। ফলে ব্যাংকঋণের মতো বন্ডের অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারকে সার্বক্ষণিক চাপে থাকতে হবে না। কিন্তু সরকারের অর্থের বিকল্প উৎস হিসেবে বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। যদিও সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটের সাথে সরকারের সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই বন্ড মার্কেট ব্যতীত কম সুদের হারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে সফল হওয়া কঠিন। কেননা সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট চালু থাকলে এবং সেই মার্কেটে যদি বন্ডগুলো ক্রয়-বিক্রয় হয়, তা হলে বিনিয়োগকারীরা অল্প সুদের হার হওয়া সত্ত্বেও বন্ড ক্রয় করবেÑ এই প্রত্যাশায় যে ভবিষ্যতে বন্ডের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বন্ড মার্কেট না থাকলে ভবিষ্যতে বন্ডের মূল্যবৃদ্ধির কোনোরকম সুযোগ থাকে না। তাই মানুষ উচ্চ সুদের হার ছাড়া বন্ড ক্রয় করতে আগ্রহী হয় না। একসময়ের এক লাখ কোটি টাকার বাজেট এখন প্রায় দশ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অথচ অর্থ সংগ্রহের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠেনি।
বিরাজমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক উৎস থেকেও পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া বেশ কঠিন। এর সাথে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অবধারিত। ফলে সার্বিকভাবে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার একটি ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করতে হবে, যদি প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করতে হয়। আর এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের একমাত্র ভরসা হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করলে দেশের ব্যাংকিং খাত যে ভয়ংকর চাপের মধ্যে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হয় তাতে এই বাজেটের বাস্তবায়ন দেশের ব্যাংকিং খাতকে এক চাপের মধ্যে ফেলে দেবে।
লেখক: নিরঞ্জন রায় (সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা)