কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন কামানের গর্জন থেমে গেছে কিন্তু ইতিহাসের প্রকৃত অধ্যায় শুরু হয়েছে তার পরেই। যুদ্ধের ধুলোবালি বসে যাওয়ার পর যে দলিলে বিজয়, পরাজয়, সমঝোতা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা লেখা হয় সেই দলিলই শেষ পর্যন্ত জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে।
এই কারণেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে যুদ্ধ যেমন আছে, তেমনি আছে শান্তিচুক্তিও। অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ী শক্তিও আলোচনার টেবিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। আবার কখনো দীর্ঘ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখেও কোনো রাষ্ট্র এমন এক অবস্থানে পৌঁছে যায়, যেখানে শান্তিচুক্তিই তার সবচেয়ে বড় বিজয়ের দলিলে পরিণত হয়।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক ১৪ দফা সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়, তাহলে তা কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা হবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “যুদ্ধক্ষেত্র নির্ধারণ করে একটি দিনের ভাগ্য, কূটনীতি নির্ধারণ করে একটি শতাব্দীর ভবিষ্যৎ”।
একটি যুদ্ধ হয়তো একটি দিনের ভাগ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু একটি সফল কূটনৈতিক সমঝোতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শতাব্দীর গতিপথ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর ইউরোপে নতুন শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল পরিকল্পনা প্রমাণ করেছিল যে, পুনর্গঠন অনেক সময় প্রতিশোধের চেয়েও শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশল।
১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের মাঝেও শান্তির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি দেখিয়েছিল, শতাব্দীব্যাপী রক্তক্ষয়ও শেষ পর্যন্ত সংলাপের টেবিলে সমাধান খুঁজে পেতে পারে।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সমঝোতার তাৎপর্য বোঝা সহজ হয়।
চুক্তির বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। যুদ্ধের অবসান, পারস্পরিক আক্রমণ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা-এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের কূটনৈতিক দাবির কেন্দ্রে ছিল।
এখানেই প্রশ্ন আসে এটা কি শুধুই সমঝোতা, নাকি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি?
মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন- “কোনো জাতি তার ভূগোলের বাস্তবতা থেকে পালাতে পারে না”।
এই উক্তির মধ্যে ইরানের বাস্তবতা গভীরভাবে নিহিত।
উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর, পূর্বে দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিমে আরব বিশ্বের সংযোগস্থলে অবস্থিত ইরান এমন একটি রাষ্ট্র, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চল শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিরও একটি জীবনরেখা।
ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার বলেছিলেন, “ভূগোলই পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে স্থায়ী নির্ধারক”।
রাষ্ট্রপতি বদলায়, সরকার বদলায়, মতাদর্শ বদলায় কিন্তু ভূগোল বদলায় না। সেই কারণেই ইরানকে ঘিরে যেকোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণে ভূগোল একটি নির্ধারক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত থাকে।
এখানে জবিগনিউ ব্রেজিনস্কির বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ইউরেশিয়া হলো বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রধান দাবাবোর্ড। ইরান সেই বোর্ডের এমন একটি ঘুঁটি, যার অবস্থান আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক গুরুত্ব লাভ করেছে।
চীন, ভারত, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং আরব বিশ্বের সংযোগস্থলে অবস্থান করার ফলে ভবিষ্যতের বাণিজ্য, জ্বালানি ও পরিবহন করিডোরে ইরানের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস ও তেল মজুদের অধিকারী দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার চাপের মুখে ছিল। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অবরোধ সব সময় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। কিউবা, রাশিয়া কিংবা অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই উদাহরণ।
ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি তার ‘চ্যালেঞ্জ ও প্রতিক্রিয়া’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, প্রতিকূলতা অনেক সময় নতুন শক্তির জন্ম দেয়। বহু বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও শিল্পখাতের বিকাশ সেই তত্ত্বেরই বাস্তব প্রতিফলন।
যদি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়, যদি জ্বালানি রপ্তানি স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসে, যদি বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ শুরু হয়, তাহলে আগামী এক দশকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে।
কিন্তু অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির বাইরেও এই সমঝোতার একটি দার্শনিক মাত্রা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি বলেছিলেন, “ভয়ের কারণে আমরা কখনো আলোচনা করব না, আবার আলোচনায় বসতেও কখনো ভয় পাব না”।
আধুনিক বিশ্বের বড় সংকটগুলোর সমাধান শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং আস্থা, যাচাইযোগ্যতা এবং সংলাপের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী যুগে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে স্যামুয়েল হান্টিংটন সতর্ক করেছিলেন সভ্যতাগত বিভাজনজনিত সম্ভাব্য সংঘাত সম্পর্কে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা যেন এই দুই তত্ত্বের মিলনস্থল একদিকে সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সংহতির প্রয়োজন। অন্যদিকে নিরাপত্তা, পরিচয় ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতিযোগিতা।
এখানেই ইউভাল নোয়া হারারির পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক- “একবিংশ শতাব্দীতে সমৃদ্ধি নির্ভর করে বিজয়ের চেয়ে সহযোগিতার ওপর বেশি”।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সমৃদ্ধি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়; বরং সংযোগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই বাস্তবতায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।
যদি এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। আঞ্চলিক অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আসতে পারে, নতুন বাণিজ্য করিডোর গড়ে উঠতে পারে এবং বহু বছরের অবিশ্বাস ধীরে ধীরে সহযোগিতার পথে রূপান্তরিত হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধৈর্য, দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত কূটনীতি।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “ক্ষোভ পোষণ করা অনেকটা বিষ পান করে শত্রুর মৃত্যুর অপেক্ষা করার মতো”।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। প্রতিশোধের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কিন্তু সংলাপ, বাস্তববাদ এবং কৌশলগত ধৈর্য নতুন ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয়।
অতএব, এই সমঝোতা যদি একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে ইতিহাস হয়তো একে কেবল যুদ্ধবিরতির দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করবে না। ইতিহাস হয়তো বলবে এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ভাষা থেকে সহযোগিতার ভাষায় কথা বলা শুরু করেছিল।
কারণ সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিজয় অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না। সেগুলো অর্জিত হয় সেই নীরব কক্ষে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অস্ত্র নামিয়ে কলম হাতে নেয়। যুদ্ধ ধ্বংসের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে; কূটনীতি নির্মাণ করে ভবিষ্যৎ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি