মোহাম্মদ আলী
প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ আলী। ফাইল ছবি
বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ এবং অস্থিরতার মধ্যেও দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক পূবালী ব্যাংক পিএলসি।
২০২৫ সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটি একদিকে যেমন শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও সুদৃঢ় সম্পদমান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অর্জন করেছে এক অভাবনীয় সাফল্য।
ঐতিহ্যবাহী
ব্যাংকিং কাঠামোর সঙ্গে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি টেকসই
অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে ধাবিত হচ্ছে।
বিগত
তিন বছরে ব্যাংকটি শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই নিশ্চিত করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের
জন্য বিপুল মূল্যের সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দর ১৬
থেকে ২০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছিল, বর্তমানে সুশাসনের প্রভাবে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭ টাকার
উর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ড প্রদানের ফলে ব্যাংকের
পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৫৬০ কোটি
টাকায় দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিন গুণেরও
বেশি বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক ও অংশীজনদের গভীর আস্থা এবং দৃঢ় সুশাসনের
বাস্তব প্রতিফলন।
বর্তমান
পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক কেবল গতানুগতিক সংকট উত্তরণেই সীমাবদ্ধ
থাকেনি। বরং প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিংকে কেন্দ্র করে একটি সুদূরপ্রসারী রূপান্তর
কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। শাখাভিত্তিক সনাতন ব্যাংকিং এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের
নিখুঁত সমন্বয়ে ব্যাংকটি গড়ে তুলেছে একটি কার্যকর ‘ফিজিশাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম’।
এর ফলে গ্রাহকেরা এখন তাদের পছন্দমতো যেকোনো মাধ্যমে, যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে অত্যন্ত
নিরাপদ উপায়ে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
ডিজিটাল
রূপান্তরের এই অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্ম ‘পাই’ (পিআই)। ২০২৫ সালের সমাপ্ত বছরে এই অ্যাপের সক্রিয় ব্যবহারকারীর
সংখ্যা ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জনে উন্নীত হয়েছে, যার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ১.৮৬
কোটি লেনদেন। বিগত বছরের তুলনায় অ্যাপটির ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেনের
পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ।
পাশাপাশি
ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থাকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ব্যাংকটি
২৫ হাজার ৫২৫টি মার্চেন্ট পস টার্মিনাল এবং ১.৪৫ লক্ষাধিক ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্থাপন
করেছে। এই উদ্যোগ গ্রামীণ ও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং খুচরা বিক্রেতাদের প্রথাগত
ব্যাংকিংয়ের মূল ধারায় যুক্ত করেছে।
পূবালী
ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদের
পরিমাণ ২০.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৮,০১৩.৬৬ কোটি টাকায়। বছরের শেষভাগে আমানতের
স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৯,৫১৯.৪৯ কোটি টাকা এবং বিতরণকৃত ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে
৭১,১৪০.৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকের একীভূত পরিচালন মুনাফা ২,৯০৭.৫৭ কোটি টাকা
এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১,০৭৯.৫৬ কোটি টাকার মাইলফলক স্পর্শ করেছে। শেয়ার প্রতি
আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮.৩০ টাকা এবং রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) ১৫.৫১ শতাংশ। এছাড়া
ব্যাংকের মূলধনী শক্তি ও ঝুঁকি সহনশীলতার পরিমাপক সিআরএআর ১৫.৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে,
যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
বর্তমান
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সংকট যেখানে খেলাপি ঋণ, সেখানে পূবালী ব্যাংক সম্পদমান
সুরক্ষায় দেখিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। যেখানে দেশের ব্যাংকিং খাতে গড় খেলাপি ঋণের (এনপিএল)
হার প্রায় ৩০.৬০ শতাংশে পৌঁছেছে, সেখানে ডেটা-নির্ভর মনিটরিং, কঠোর ঋণ তদারকি ও কার্যকর
আদায় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূবালী ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.২০ শতাংশে ধরে
রাখতে সক্ষম হয়েছে।
জাতীয়
অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতেও ব্যাংকটির অবদান ছিল
চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালে পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৮,৬৬৪.২৬ কোটি টাকার রপ্তানি এবং
৪৭,৩১৩.৭৪ কোটি টাকার আমদানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের
ওপর ভরসা করে প্রবাসীরা ১১,৩৬২.১৩ কোটি টাকার বৈদেশিক রেমিট্যান্স বৈধ পথে দেশে পাঠিয়েছেন।
ব্যবসায়িক
মুনাফার পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই অর্থায়নে জোর
দিচ্ছে ব্যাংকটি। মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন টেকসই পোর্টফোলিওর অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশবান্ধব
ব্যাংকিংয়ের অংশ হিসেবে ৪১১টি শাখা ও ৪৫৩টি এটিএম/সিআরএম বুথে সৌরশক্তি ব্যবহার করা
হচ্ছে। এছাড়া ৩৭টি লিড-সার্টিফাইড কারখানায় অর্থায়ন, আইএফআরএস এস-১ ও এস-২ অনুসরণ
এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘ডিকার্বনাইজেশন পলিসি’
বাস্তবায়ন করছে ব্যাংকটি।
২০২৬-২০২৮
সালের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকটি আগামী বছরজুড়ে একটি 'ক্যাশলেস ব্যাংকিং
ক্যাম্পেইন' পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে খুচরা ব্যবসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, করপোরেট ও
সিএমএসএমই খাতে ডিজিটাল লেনদেন বহুগুণ প্রসারিত হবে। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও
ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। পূবালী ব্যাংক তাদের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপ-শাখা, ২২টি
ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম বুথ ও ডিজিটাল অ্যাপের সমন্বয়ে 'ব্যাংকিং
দ্য আনব্যাংকড' স্লোগানকে ধারণ করে প্রান্তিক জনগণকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিচ্ছন্ন সুশাসন, সময়োপযোগী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক
সেবার এই ধারাবাহিকতা আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে পূবালী ব্যাংককে
আরও সংহত অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে আশা করছি।
লেখক: মোহাম্মদ আলী (ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী,পূবালী ব্যাংক পিএলসি)