ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৯ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১৯ ঘণ্টা আগে
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি
রাজনীতির অঙ্গনে কখনও কখনও এমন সকল চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে, যাহাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করিলে সাধারণ মানুষের মনে গভীর দার্শনিক প্রশ্নের উদ্ভব হয়। তাহারা কি প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রপরিচালনার গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, না কি কোনো বৃহৎ নাট্যমঞ্চের সুদক্ষ অভিনেতা? তাহারা কি নীতিনির্ধারক, না কি ব্যাখ্যাশিল্পী? নাকি উভয়ই?
সাম্প্রতিক কালে এক সম্মানিত উপদেষ্টার পাসপোর্ট-পরিক্রমা লইয়া যে কৌতূহলোদ্দীপক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং লোকরস-এই তিন বিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিরল গবেষণার বিষয় হইয়া উঠিয়াছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি সাধারণ প্রশ্ন হইতে। জানা গেল, মহোদয় বিদেশ ভ্রমণে গিয়াছেন সাধারণ পাসপোর্ট লইয়া, কিন্তু সেই সাধারণত্বের উপর আবার কৌশলপূর্বক সংযোজিত হইয়াছে সার্ক-সুবিধার বিশেষ স্টিকার। ইহা শুনিয়া জনগণের একাংশের মনে প্রশ্ন জাগিল-যদি কূটনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করিবারই ইচ্ছা থাকে, তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের সহিত এমন মান-অভিমান কেন?
একজন রসিক মন্তব্য করিলেন, 'ইহা সম্ভবত আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা, যাহা এখনও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। বিষয়টির নাম হইতে পারে-‘কূটনৈতিক সুবিধার নাগরিক ব্যবহারবিজ্ঞান’।'
আরেকজন বলিলেন, 'সম্ভবত ইহা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। পদ থাকুক বা না থাকুক, ভ্রমণের ইতিহাস তো রইল!'
জনগণের কৌতূহল বাড়িল, ব্যাখ্যাও বাড়িল। আমাদের দেশে ব্যাখ্যার অভাব কখনও হয় না। বরং কোনো কোনো সময় ব্যাখ্যার পরিমাণ ঘটনা অপেক্ষা অধিক হইয়া দাঁড়ায়।
বস্তুত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জগতে নিয়মকানুন নামক এক বিচিত্র বস্তু বিদ্যমান। ইহা সাধারণ মানুষকে যেমন মানিতে হয়, রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও তেমনি মানিতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিশেষ সৌন্দর্য এই যে, মাঝে মাঝে এমন কিছু জ্ঞানীগুণীর আবির্ভাব ঘটে, যাহারা মনে করেন-নিয়মের উদ্দেশ্য মূলত অন্যদের জন্য; নিজের জন্য নহে।
ফলতঃ একটি সামান্য বিদেশ সফর কখনও কখনও এমন এক কূটনৈতিক ধাঁধায় পরিণত হয়, যাহা সমাধানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাথা চুলকাইতে হয়। তাহারা তখন নীরবে ভাবেন-'ইহা আবার কোন নতুন অধ্যায়? আমরা কি কূটনীতি পরিচালনা করিতেছি, না কি রহস্যোপন্যাস পাঠ করিতেছি?'
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রপরিচালনায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বস্তু শত্রু নহে; বরং অতি-আত্মবিশ্বাসী বন্ধু।
শত্রু অন্তত কোথায় দাঁড়াইয়া আছে তাহা জানা যায়। কিন্তু বন্ধু যদি প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন ব্যাখ্যার জন্ম দেন, তবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজের চেয়ে ব্যাখ্যা প্রদানে অধিক সময় ব্যয় করিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও মনে হয়, রাষ্ট্রের প্রধান শিল্প হইয়া দাঁড়াইয়াছে ‘ব্যাখ্যা উৎপাদন’।
একসময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ছিল। পরে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি আসিল। ভবিষ্যতে হয়তো ইতিহাসবিদগণ লিখিবেন-'বাংলাদেশে একসময় ব্যাখ্যাভিত্তিক অর্থনীতিরও বিকাশ ঘটিয়াছিল।'
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। রাষ্ট্রে কি মুখপাত্রের এতই অভাব ঘটিয়াছে যে, যাহাকে-তাহাকেই জনমতের ভাষ্যকাররূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে?
মুখপাত্রের পদ কেবল বাকপটুতা দ্বারা পূর্ণ হয় না। ইহার সহিত জড়িত থাকে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, সাংগঠনিক অবস্থান, নীতিগত স্পষ্টতা এবং জনমতের প্রতি সংবেদনশীলতা। কিন্তু কোনো কোনো সময় এমন ব্যক্তিদের বক্তব্য শুনিতে পাওয়া যায়, যাহারা একযোগে মুখপাত্র, বিশ্লেষক, কূটনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রদার্শনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পূর্ণকালীন যোদ্ধা বলিয়া নিজেকে উপস্থাপন করেন।
তাহাদের বক্তব্য শুনিয়া জনগণ কখনও কখনও বিভ্রান্ত হইয়া পড়ে।
ইহা কি সরকারি অবস্থান? না কি ব্যক্তিগত মতামত? না কি দুপুরের খাবারের পর আকস্মিকভাবে উদ্ভূত কোনো দার্শনিক উপলব্ধি?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ইহা একটি জটিল প্রশ্ন। চায়ের দোকানের ভাষায় অবশ্য উত্তরটি অনেক সহজ।
যখন কোনো সম্মানিত উপদেষ্টা এমন দৃঢ়তার সহিত কোনো বক্তব্য প্রদান করেন, যাহা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ বলিয়া প্রতীয়মান হয় না, তখন জনগণ বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করেন 'মহাশয় কি এমন কোনো তথ্য জানেন, যাহা আমরা জানি না?'
অথবা,
'আমরা কি এমন এক দেশে বাস করিতেছি, যাহা তিনি দেখিতে পান না?'
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ইহাকে ‘তথ্যগত দূরত্ব’ বলা যাইতে পারে। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে ইহার আরও কয়েকটি জনপ্রিয় নাম আছে, যাহা ভদ্রসমাজে উদ্ধৃত করা সমীচীন হইবে না।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি আকর্ষণীয় প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়। ইহারা ক্ষমতার সময় রাষ্ট্রযানের সামনের আসনে বসিতে অত্যন্ত উৎসাহী।
রাষ্ট্রযান চলিতেছে-ইহারা উপস্থিত। ক্যামেরা আছে-ইহারা উপস্থিত।
সুবিধা আছে-ইহারা উপস্থিত।
বিদেশ সফর আছে-ইহারা অবশ্যই উপস্থিত।
কিন্তু যখন দিগন্তে সামান্য ঝড়ের মেঘ দেখা যায়, তখন এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইহারা ধীরে ধীরে অন্তরাল গ্রহণ করেন।
পরে ইতিহাস যখন প্রশ্ন করে, তখন উত্তর আসে- 'আমি তো প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থানে ছিলাম না।'
'আমাকে কাজ করিতে দেওয়া হয় নাই।'
'আমি বিষয়টি জানিতাম না।'
'আমি তখন বিদেশে ছিলাম।'
'আমি আসলে পরামর্শ দিয়াছিলাম, কিন্তু কেহ শোনে নাই।'
এই সকল বক্তব্য ইতিহাসের আদালতে সাধারণত যুদ্ধশেষে পরাজিত সেনাপতির আত্মপক্ষসমর্থনের ন্যায় শোনায়।
দুর্দিনে অনুপস্থিত থাকিবার পর সুদিনে উপস্থিতির ব্যাখ্যা সাধারণত খুব শক্তিশালী যুক্তি হিসাবে গণ্য হয় না।
রাজনীতির জগতে আনুগত্যের প্রকৃত পরীক্ষা সুসময়ে নহে; দুঃসময়ে।
সূর্য উজ্জ্বল থাকিলে সকলেই জাহাজে উঠিতে চায়।
কিন্তু ঝড়ের দিনে কাহারা ডেকে দাঁড়াইয়া থাকে, ইতিহাস মূলত তাহাই মনে রাখে।
যে নাবিক ঝড়ের রাতে জাহাজে থাকে, ইতিহাস তাহার নাম স্মরণ করে।
আর যে ব্যক্তি বন্দরে দাঁড়াইয়া পরে দাবি করে-'আমি তো আসলে জাহাজের লোকই ছিলাম না।'
তাহাকে ইতিহাস সাধারণত পাদটীকাতেও স্থান দেয় না।
আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন এক শক্তিশালী মঞ্চে পরিণত হইয়াছে, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলিয়া ঘোষণা করিতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ফেসবুক পোস্ট প্রদান-এই দুই কর্মের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।
ফেসবুকে ভুল হইলে সর্বোচ্চ একটি পোস্ট মুছিয়া ফেলা যায়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল হইলে অনেক সময় কয়েক বৎসর ধরিয়া তাহার মূল্য পরিশোধ করিতে হয়।
এই কারণে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বক্তব্যের ওজন সাধারণ নাগরিকের বক্তব্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি।
কিন্তু কোনো কোনো সময় এমনভাবে বক্তব্য প্রদান করা হয়, যেন রাষ্ট্র পরিচালনা একটি দীর্ঘ টক-শো এবং জনগণ কেবল দর্শক।
বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। জনগণ দর্শক নহে; জনগণই শেষ পর্যন্ত বিচারক।
নির্বাচন, ইতিহাস এবং জনমত-এই তিন আদালতের রায় বিলম্বিত হইতে পারে, কিন্তু বাতিল হয় না।
সুতরাং জনগণের প্রশ্নকে অবজ্ঞা করিবার অবকাশ নাই।
রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠান এবং জনমতকে প্রভাবিত করিবার ক্ষমতা-এই তিনের সহিত জবাবদিহিতাও সমানভাবে যুক্ত।
অন্যথায় একদিন দেখা যাইবে, রাষ্ট্রের ভার বহন করিতেছে কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, আর সুবিধার ছায়াতলে অবস্থানকারী অনেকে সময়মতো নিজেদের পরিচয় পরিবর্তন করিতেছেন।
আজ উপদেষ্টা, কাল নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ। আজ নীতিনির্ধারক, কাল পর্যবেক্ষক। আজ সিদ্ধান্তের অংশীদার, কাল সিদ্ধান্তের সমালোচক। এই রূপান্তরের গতি অনেক সময় গিরগিটির রঙ পরিবর্তনের গতিকেও লজ্জায় ফেলিতে পারে।
অতএব রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়োগের পূর্বে কেবল জীবনবৃত্তান্ত দেখিলেই চলিবে না।
ডিগ্রি গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। বুদ্ধিমত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তাহার সহিত আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য।
আদর্শিক স্থিরতা। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। সংকটকালে অবস্থান গ্রহণের সক্ষমতা। এবং সর্বোপরি-কঠিন সময়ে পালাইবার প্রবণতা আছে কি না।
কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ভ্রমণ ক্লাব নহে, যেখানে সুবিধাজনক সময়ে সদস্যপদ গ্রহণ এবং অসুবিধাজনক সময়ে সদস্যপদ স্থগিত রাখা যায়। রাষ্ট্র পরিচালনা একটি দীর্ঘ ও দায়িত্বপূর্ণ যাত্রা। সেখানে পদমর্যাদা কেবল সম্মানের উৎস নহে; জবাবদিহিতারও উৎস। পাসপোর্টের রং পরিবর্তিত হইতে পারে। স্টিকারের আকার পরিবর্তিত হইতে পারে।
ব্যাখ্যার দৈর্ঘ্যও পরিবর্তিত হইতে পারে। কিন্তু জনমতের আদালতে প্রশ্নের সংখ্যা সাধারণত কমে না।
বরং প্রতিটি নতুন ব্যাখ্যার সহিত আরও দুইটি নতুন প্রশ্ন জন্ম লয়।
ফলতঃ একসময় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়, যখন ঘটনাটি অপেক্ষা ঘটনাটির ব্যাখ্যাই অধিক আলোচিত হইতে থাকে।
তখন জনগণ হাসিমুখে কিন্তু গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলে- 'রথের ঘোড়া যত না সামনে টানিতেছে, সারথিদের ব্যাখ্যাই তত বেশি পিছনে টানিতেছে।' এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতি শুভকামনা লইয়াই বলা যায়- সরকারি দায়িত্বে থাকিলে সরকারি নিয়ম মানিতে হইবে। সরকারি সুবিধা গ্রহণ করিলে সরকারি জবাবদিহিতাও গ্রহণ করিতে হইবে।
কারণ গণতন্ত্রে জনগণ অনেক কিছু ক্ষমা করে, কিন্তু অস্পষ্টতা খুব কমই ভুলে।
অতএব রাষ্ট্র যদি এক সুসংগঠিত রথ হয়, তবে তাহার সারথিদেরও রথের নিয়ম মানিতে হইবে। অন্যথায় যাত্রাপথে গন্তব্য অপেক্ষা কৌতুকই অধিক জন্ম লইবে।
আর জনগণ শেষপর্যন্ত মৃদু হাসিয়া বলিবে- 'হে মহাশয়গণ, রাষ্ট্র পরিচালনা করুন; নাট্যোৎসব পরে হইলেও চলিবে। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাস লেখা হয় কর্মে, ব্যাখ্যায় নয়; আর পাসপোর্টের রঙের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হইল দায়িত্বের রং।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ