মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬ ১০:২৯ এএম
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ১৬ জুন ‘কালো দিবস’ হিসেবে পরিচিত।
১৯৭৫ সালের এদিনে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে দেশের প্রায় সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল সংবাদমাধ্যমের জন্য এক গভীর আঘাত। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে আজও আলোচনা ও বিতর্ক বিদ্যমান। প্রতি বছর ১৬ জুন এলে সেই ইতিহাস নতুন করে স্মরণ করা হয়।
সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। জনগণের অধিকার রক্ষা, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। এদেশের গণতান্ত্রিক ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বে সংবাদপত্র জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয় এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়।এরই সে বছর ১৬ জুন দেশের চারটি পত্রিকা সরকারি মালিকানায় রেখে বাতি সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অসংখ্য সাংবাদিক, সম্পাদক, মুদ্রাকর্মী ও সংবাদকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েন।
অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একসময় সংবাদপত্র ছিল
মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও
সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের আন্তরিকতা ও পেশাদারত্ব ছিল প্রশংসনীয়। একটি সংবাদ
প্রকাশের আগে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বহুস্তরীয় সম্পাদনা
প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। ফলে সংবাদ প্রকাশে সময় লাগলেও তথ্যের
নির্ভুলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
বর্তমান সময়ে সংবাদপত্র সম্পূর্ণ নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব সংবাদ পরিবেশনের ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন আর মানুষ পরদিন সকালের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করে না। একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা অনলাইন পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ কিংবা সামাজিকমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
সেকাল ও একালের সংবাদপত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো
সংবাদ পরিবেশনের গতি। অতীতে সংবাদ প্রকাশে সময় লাগলেও তা ছিল অধিকতর যাচাইকৃত ও
বিশ্লেষণধর্মী। বর্তমানে সংবাদ দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে, কিন্তু কখনও কখনও সেই দ্রুততার
কারণে নির্ভুলতা ও গভীরতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার অতীতে পাঠকের প্রতিক্রিয়া
জানতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, অথচ এখন পাঠক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মন্তব্য,
প্রতিক্রিয়া কিংবা সমালোচনা জানাতে পারেন।
তবে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে কেবল সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ
নেই। বরং এটি সংবাদপত্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। অনুসন্ধানী
সাংবাদিকতা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আরও শক্তিশালী হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বেড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক সাংবাদিকতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই সঙ্গে
প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরও এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
১৬ জুনের কালো দিনের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কখনোই স্বতঃসিদ্ধ নয়, এটি রক্ষা করতে হয়। রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণমাধ্যমÑ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক সংবাদব্যবস্থা গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পেশাগত নৈতিকতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
১৬ জুন বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক দিন হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে তাদের দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। সমাজ থেকে অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার একটি রাষ্ট্রে ফ্যাসিবাদী তথা কর্তৃত্বপরায়ন শাসনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আর সেজন্যই স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ফ্যাসিবাদী শাসকদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। ১৯৭৫ সনে বাকশাল সরকারও একই কারণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছিল। সে কলঙ্কজনক অধ্যায় কখনো মুছে যাবে না। ১৬ জুন প্রতিবছর আমাদের সে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন (ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী)