সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ‘বিনিয়োগ গন্তব্য’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
সেই লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক, নিরপেক্ষ ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রসঙ্গও উঠে আসে। শনিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সম্মেলনে এ অঙ্গীকার করা হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ জনশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজারকে সামনে রেখে এই অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু অঙ্গীকার নয়, বাস্তবায়নে প্রয়োজন কার্যকর নীতি, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
গতকাল
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের গন্তব্য হতে চায়’ শীর্ষক
প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী
বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমৃদ্ধি ও মর্যাদার ন্যায্য
অধিকার ভোগ করবে। সেজন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সরকার
প্রস্তুত।’ তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত
করেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের
পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হচ্ছেÑ বাংলাদেশ ফার্স্ট। তাই বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি স্থিতিশীল
বিনিয়োগের পরিবেশ জরুরি। আমরা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নির্ভরযোগ্য ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ
তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে প্রথম
প্রয়োজন আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তিনি দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি আরও শক্তিশালী
করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে বিশ্বমানের
বন্দর সুবিধা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস সংস্কার এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক
উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানান বিডার চেয়ারম্যান আশিক
চৌধুরী। এ কথা সত্য, বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল শিল্প এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান
ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান খাত। তাই বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আন্তরিকভাবে
কাজ করার বিকল্প নেই।
বিদেশি
বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের আগ্রহ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের যে অঙ্গীকার ব্যক্ত
করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক কূটনীতি শুধু
রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং
কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম হাতিয়ার। বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকদেরও এখন
বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আহ্বান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির ওপর অধিক
গুরুত্ব দিতে হবে।
উল্লেখ
করা প্রয়োজন, নানা প্রতিকূলতার পরও গত এক দশকে বাংলাদেশ
উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন
বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এবং রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ দেশের
অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার
সংযোগস্থলে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে
একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। তবে বিনিয়োগকারীদের
আকৃষ্ট করতে হলে কিছু দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা, নীতির ধারাবাহিকতার ঘাটতি, ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, কর কাঠামোর
অস্পষ্টতা এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এখনও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। অনেক
বিদেশি বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন যে, অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং বিভিন্ন
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া বিনিয়োগ
আহ্বানের বার্তা প্রত্যাশিত ফল দেবে না। এ ছাড়া আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের
নিশ্চয়তা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য
অপরিহার্য। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার নয়,
ব্যবসার পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দেয়। তাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তা ছাড়া বিগত সময়ের দুর্নীতি-অনিয়ম ও
অব্যবস্থাপনার ফলে বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে যে নেতিবাচক আবহ সৃষ্টি হয়েছে, কার্যকর
পদক্ষেপের মাধ্যমে তা দূর করতে হবে।
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বিনিয়োগ ‘গন্তব্য’ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা অমূলক নয়। বরং এটি একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্ক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা অত্যাবশ্যক। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে কেন্দ্র করে সরকার, বেসরকারি খাত এবং বিদেশি অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে উঠলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন সম্ভব হবে। আমরা মনে করি, সম্মেলনে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, তা যদি বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ পায় এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা যায়; তাহলে বাংলাদেশ বাস্তবিকই দক্ষিণ এশিয়ার বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হবে।
সম্পাদকীয়