কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশ : ৫৯ মিনিট আগে
আপডেট : ৩৭ মিনিট আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক মার্টিন রুবিন একবার বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক মুখোশের আড়ালে একটি মুখ থাকে, আর সেই মুখের আড়ালে থাকে একটি গল্প।’
সংক্ষিপ্ত এই উক্তির মধ্যেই যেন মানুষের জীবন, সমাজ এবং ইতিহাসের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে মুখোশ পরি। কখনও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য, কখনও সম্মান রক্ষার জন্য, কখনও-বা নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা কিংবা ভুলকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুখোশ কি সত্যকে আড়াল করতে পারে?
বাস্তবতা হলো,
মানুষ অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরকাল বন্দি করে রাখতে পারে না। ব্যক্তিজীবনে
যেমন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনেও তেমনি। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, অসংখ্য ক্ষমতাবান
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুপরিকল্পিত গোপনীয়তা শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়েছে, সত্য প্রকাশিত
হয়েছে। ওয়াটারগেট
কেলেঙ্কারিসহ করপোরেট জালিয়াতির নানা ঘটনা কিংবা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অপকর্ম তারই প্রমাণ।
সত্যকে হয়তো বিলম্বিত করা যায়, কিন্তু হত্যা করা যায় না।
নোবেলজয়ী রুশ
সাহিত্যিক আলেকজান্ডার সলঝেনিৎসিন সোভিয়েত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,
‘মিথ্যার ভেতর বাস করো না।’ তার এই আহ্বান শুধু রাজনৈতিক ছিলনা; এটি ছিল মানুষের আত্মিক
মুক্তির ডাক। কারণ মানুষ যখন নিজের জীবনকে মিথ্যার ওপর দাঁড় করায়, তখন সে কেবল অন্যকে
নয়, নিজেকেও প্রতারিত করে। সলঝেনিৎসিনের আরেকটি বিখ্যাত উক্তি আরও তাৎপর্যপূর্ণÑ ‘সত্যের
একটি মাত্র শব্দও সমগ্র বিশ্বের মিথ্যার চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে।’ ইতিহাসে এমন বহু
মুহূর্ত এসেছে, যখন একজন মানুষের উচ্চারিত সত্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠিত মিথ্যাকে চ্যালেঞ্জ
জানিয়েছে। একসময় পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও সম্প্রদায় মানুষকে ভুল থেকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব
পালন করত। এখন সেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল। ফলে অনেক ভুল, অন্যায় ও নৈতিক
বিচ্যুতি যেন লাগামছাড়া হয়ে পড়েছে। কেউ তার মালিকানা স্বীকার করতে চায় না, সংশোধনের
উদ্যোগও নেয় না।
হলোকাস্টের ভয়াবহতা
থেকে বেঁচে ফেরা নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী এলি উইজেল বলেছিলেন, ‘ভালোবাসার বিপরীত ঘৃণা
নয়; উদাসীনতা।’ এই কথার গভীর তাৎপর্য রয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলা, সত্য জানার
পরও নীরব থাকা কিংবা নৈতিক প্রশ্নে উদাসীন থাকাÑ এসবই শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের শক্তিকে
বাড়িয়ে দেয়। আজকের পৃথিবীতে নৈতিক উদাসীনতা একটি বড় সংকট। আমরা অনেক কিছু দেখি, জানি,
বুঝি; কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানাই না। কারণ সত্য উচ্চারণের সঙ্গে প্রায়ই ঝুঁকি জড়িয়ে
থাকে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, নীরবতা কখনও স্থায়ী নিরাপত্তা দেয় না।
চেক রাষ্ট্রনায়ক
ও চিন্তাবিদ ভাকলাভ হাভেল তার ‘সত্যের মধ্যে বেঁচে থাকা’ দর্শনে দেখিয়েছেন, একজন সাধারণ
মানুষও যখন বিবেকের তাড়নায় সত্যের পাশে দাঁড়ায়, তখন সে অসত্যের বিশাল কাঠামোকেও নাড়িয়ে
দিতে পারে। সত্যের সংগ্রাম মূলত ক্ষমতার সংগ্রাম নয়; এটি আত্মার স্বাধীনতার সংগ্রাম।
মার্কিন গীতিকবি
ও নোবেলজয়ী বব ডিলান তার বিখ্যাত গানে প্রশ্ন রেখেছিলেনÑ ‘একজন মানুষকে মানুষ বলার
আগে তাকে আর কত পথ হাঁটতে হবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর কোনো দূরত্বে বা সময়ের হিসাবে নেই।
এর উত্তর নিহিত আছে মানুষের নৈতিক পরিপক্বতায়, সত্যকে গ্রহণ করার সাহসে এবং ভুল স্বীকার
করার সততায়।
জার্মান দার্শনিক
ফ্রিডরিখ নীটশে লিখেছেন, ‘তুমি যদি দীর্ঘ সময় অতল গহ্বরের দিকে তাকিয়ে থাক, একসময় সেই
গহ্বরও তোমার দিকে তাকাতে শুরু করবে।’ অর্থাৎ অসত্যের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান একসময়
মানুষকে বদলে দেয়। তখন মিথ্যা শুধু আচরণের অংশ থাকে না; তা চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে।
মহাত্মা গান্ধী
বলেছেন, ‘সত্য কখনও ন্যায়ের ক্ষতি করে না।’ সত্যের এই শক্তি হয়তো তাৎক্ষণিক নয়, স্থায়ী।
মিথ্যা কখনও কখনও সাময়িক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের ভেতরের
শান্তি, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষয় করে। এই কারণেই আমাদের প্রয়োজন অন্তর্গত নির্জনতা।
এমন কিছু মুহূর্ত, যখন মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলে, নিজের ভুলগুলোকে দেখে, নিজের বিবেকের
কাছে জবাবদিহি করে। সেখানে কোনো বাহ্যিক করতালি নেই, কোনো সামাজিক মর্যাদার মোহ নেই;
আছে শুধু নিজের সঙ্গে নিজের সাক্ষাৎ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর লিখেছিলেন- ‘সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,/
সে কখনও করে না বঞ্চনা।’
সত্যের পথ কখনও
সহজ নয়। কিন্তু সত্যই মানুষকে আত্মমর্যাদা দেয়, প্রজ্ঞা দেয় এবং মুক্তি দেয়। শেষ পর্যন্ত
মানুষকে তার মুখোশ নয়, তার গল্পই সংজ্ঞায়িত করে। আর সেই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অংশ হলোÑ সে কতবার হোঁচট খেয়েছে তা নয়; বরং প্রতিবার পতনের পর কতবার সত্যের দিকে ফিরে
এসেছে। কারণ মুখোশ মানুষকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে, কিন্তু সত্যই মানুষকে মুক্তি
দেয়। আর যে মানুষ সত্যের কাছে ফিরে আসতে পারে,
সে-ই প্রকৃত অর্থে নিজেকে জয় করতে পারে।
বিষয়টি দেখার নয়, উপলব্ধির; ক্ষমতার নয়, প্রজ্ঞার; মুখোশের নয়, মানুষের।
কাজী জিয়া উদ্দিন
অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি