× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশ্নটা সরল, উত্তর কঠিন

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩৫ মিনিট আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে বিচিত্র ঘটনার অভাব কখনও ছিল না। তথাপি সাম্প্রতিককালের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত ঘটনাটি এমন এক অভিনব দৃষ্টান্ত, যা দেখে সাধারণ নাগরিক প্রশ্ন করতে বাধ্য-রাষ্ট্রের প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে পরিচালনা করছেন কে?

একদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যথাবিধি প্রজ্ঞাপন জারি করল- বিসিএস ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান খানকে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হল। রাষ্ট্রের বিধিবদ্ধ কাঠামো অনুসারে এটাই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যে মন্ত্রণালয়ে তাকে পদায়ন করা হল, সে মন্ত্রণালয়ে তার যোগদানই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।

প্রজ্ঞাপন বলছে, ‘আপনি সচিব।’ কিন্তু বাস্তবতা যেন বলছে, ‘অপেক্ষা করুন।’ প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থা কি এখন প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিচালিত হয়, নাকি ব্যক্তিগত সম্মতি দ্বারা?

সাধারণত সচিব পদে নিয়োগ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সচিব কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী নন; তিনি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা। মন্ত্রী ও সচিব একত্রে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও নিয়োগের উৎস এবং কর্তৃত্বের ভিত্তি পৃথক।

অতএব, যখন দেখা যায় একজন প্রজ্ঞাপনপ্রাপ্ত সচিব কার্যত দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছেন না, তখন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের উদ্ভব ঘটে।

ঘটনার আরও কৌতুককর দিক হল, নিয়োগের আগে নয়, আপত্তি উঠল নিয়োগের পরে। সাধারণত আপত্তির নিষ্পত্তি হওয়ার পরই সিদ্ধান্ত আসে; এখানে সিদ্ধান্ত এলো আগে বিতর্ক শুরু হল পরে। যেন সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পর আরম্ভ হয়।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নবনিযুক্ত কর্মকর্তাকে অবমুক্ত করে দিয়েছে। অর্থাৎ তিনি আর পুরনো দপ্তরের নন। আবার নতুন দপ্তরেও পূর্ণাঙ্গভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছেন না। প্রশাসনিক অভিধানে এই অবস্থার উপযুক্ত সংজ্ঞা থাকলে অভিধান প্রণেতাদেরই হয়তো জানা আছে।

ফলত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে রুটিন দায়িত্বে কার্যক্রম চলছে। কিন্তু রুটিন দায়িত্বেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষত, বাজেট-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব প্রশাসনিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কিছু সূত্র আবার বলছে, সংশ্লিষ্ট মহলে হয়তো ‘ভুল তথ্য’ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই শব্দবন্ধের সৌন্দর্য এখানে যে এটা প্রায় সব পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম। কে তথ্য দিল, কী তথ্য দিল, কেন দিলÑ এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়েও ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক অভিধানে ‘ভুল তথ্য’ সম্ভবত এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় শক্তি। কোনো নিয়োগ আটকানো হলে ভুল তথ্য। কোনো বদলি বিলম্বিত হলেÑ ভুল তথ্য। কোনো সিদ্ধান্ত বদল হলে ‘ভুল তথ্য।’ ফলে কখনও কখনও মনেহয়, দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অদৃশ্য ব্যাখ্যাগুলোই অধিক কার্যকর।

অবশ্য এ ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন নয়। প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা নাট্যকারদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে। কিছুদিন আগে দেখা গিয়াছিল, সকালে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হল। অভিনন্দনের বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু বিকালের মধ্যেই সেই আদেশ স্থগিত হয়ে গেল। অর্থাৎ সকালে যিনি সচিব, বিকালে তিনি আর সচিব নন।

প্রশাসনের এই গতিশীলতা দেখে পদার্থবিজ্ঞানের কিছু সূত্রও হয়তো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন অনুভূত হতে পারে। ঘটনার অন্তরালে নানা ব্যাখ্যাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ বলছেন, নবনিযুক্ত সচিব পূর্বতন ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়াই আপত্তির কারণ। আবার কেউ

 বলছেন, বাণিজ্য-সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়েই আপত্তি। কিন্তু এই যুক্তিগুলোও প্রশ্নমুক্ত নয়।

বাংলাদেশের প্রশাসনে কতজন সচিব আছেন, যারা সমগ্র চাকরি জীবন একই খাতে অতিবাহিত করেছেন? আজ যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, কাল তিনি অর্থ বিভাগে; যিনি স্বাস্থ্যে, তিনি পরদিন সেতু বিভাগে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল দর্শনই তো হলÑ একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। অতএব, অভিজ্ঞতার প্রশ্ন যদি এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়, তবে ভবিষ্যতে বহু পদায়নই একই যুক্তিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

আরও একটি আলোচিত বিষয় হল আত্মীয়তার প্রসঙ্গ। প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন চলছে যে, নবনিযুক্ত কর্মকর্তা একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়। কিন্তু আত্মীয়তা কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্যও করেনা, যোগ্যও প্রমাণ করে না। রাষ্ট্রের বিচার হওয়া উচিত কর্মদক্ষতা, সততা এবং বিধিবদ্ধ নিয়মের ভিত্তিতে; গুঞ্জন কিংবা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভিত্তিতে নয়। বস্তুত, এই ঘটনাকে অনেকে কেবল একজন কর্মকর্তার যোগদানÑ বিলম্ব হিসেবে দেখছেন না। বরং এটাকে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য, ক্যাডার-রাজনীতি, পদায়ন-প্রতিযোগিতা এবং প্রভাব বলয়ের সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ বলে বিবেচনা করছেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অন্যত্র। যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একজনকে সচিব নিয়োগ দেয়, পুরনো মন্ত্রণালয় তাকে অবমুক্ত করে, নতুন মন্ত্রণালয়ে যোগদান অনিশ্চিত থাকে, আর অন্য কর্মকর্তা রুটিন দায়িত্বে কাজ চালাতে থাকেন, তবে কার্যত প্রশাসন পরিচালনা করছে কে- প্রজ্ঞাপন? মন্ত্রী? নাকি মন্ত্রণালয়? নাকি সেই অদৃশ্য শক্তি, যার নাম কোনো সরকারি নথিতে লেখা থাকে না, কিন্তু প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি করিডোরে যার উপস্থিতি অনুভূত হয়?

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিধি, প্রজ্ঞাপন ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে যদি অনানুষ্ঠানিক প্রভাব অধিক কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি কেবল একজন কর্মকর্তার নয়। ক্ষতি হয় প্রতিষ্ঠানের দধা রাষ্ট্রের। আর এর ফলে দুর্বল হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।

আজ দেশের সচেতন নাগরিকরা তাই কেবল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন না যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে কে বসবেন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন-রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কোথায়? কারণ জনপ্রশাসনের মৌলিক ভিত্তি হল নিয়মের পূর্বানুমেয়তা। প্রজ্ঞাপন যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে সিদ্ধান্তের প্রকৃত উৎস কোথায়Ñ সেই প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার আছে।

রাষ্ট্র চলে বিধি দ্বারা, গুঞ্জন দ্বারা নয়। রাষ্ট্র চলে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে, করিডোরের কানাঘুষায় নয়। আর যদি বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বলে থাকে, তাহলে জনগণ অন্তত এতটুকু জানার অধিকার রাখেÑ প্রজ্ঞাপন জারি করেন কে, আর প্রশাসন চালান কে? কারণ বর্তমান বাস্তবতায় মনে হচ্ছে প্রজ্ঞাপনই শেষ কথা নয়; অনেক সময় প্রজ্ঞাপনের পরই আসল গল্প শুরু হয়।


ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

সিনিয়র সাংবাদিক


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা