স্মরণ
মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
কীর্তিমান সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আনোয়ার জাহিদ। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে আনোয়ার জাহিদ একটি উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র নাম।
তার নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বর্ণাঢ্য জীবন, যার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে সংগ্রাম, আদর্শ, সাহস, আত্মমর্যাদা এবং দেশপ্রেমের দীপ্ত ছাপ। তিনি ছিলেন একাধারে খ্যাতিমান সাংবাদিক, প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক চিন্তক, সাবেক মন্ত্রী এবং জনমানুষের নেতা। সময়ের প্রবাহে অনেকেই বিস্মৃত হয়েছেন, কিন্তু আনোয়ার জাহিদের অবদান আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৩৮
সালে তৎকালীন ঝিনাইদহ মহকুমার নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তার জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি
ছিলেন মেধাবী, সচেতন এবং সমাজমনস্ক। ঝিনাইদহে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে
তিনি খুলনার ব্রজলাল কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং পরে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক
ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং দ্রুত একজন মেধাবী ও জনপ্রিয়
ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ষাটের
দশকের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে কজন ছাত্রনেতা তাদের অসাধারণ বক্তৃতাশৈলী ও
সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে ছাত্রসমাজের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন, আনোয়ার
জাহিদ তাদের অন্যতম। ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতির গভীর জ্ঞানকে তিনি এমনভাবে
উপস্থাপন করতেন, যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। তার বক্তব্য চলাকালে সভাস্থলে পিনপতন
নীরবতা নেমে আসত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের অনেকেই
তার বক্তৃতার ধরন অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন।
সাংবাদিকতা
ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান অধ্যায়। দৈনিক ইত্তেহাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক
জনতা, হলিডে এবং আওয়াজসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
বিশেষ করে সম্পাদক হিসেবে তার বিশ্লেষণধর্মী লেখনী তাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়।
সাংবাদিকদের অবিভক্ত সংগঠন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থেকেও তিনি সাংবাদিক
সমাজের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের
অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তিনি ছিলেন নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
পরবর্তীকালে
দেশের বৃহত্তর কল্যাণে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশায় তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয়
হন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্ব
অতিক্রম করে তিনি ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে সংসদ
সদস্য নির্বাচিত হন। তথ্য, ত্রাণ এবং শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন
করেন। তবে ক্ষমতার প্রতি মোহ নয়, আদর্শ ছিল তার মূল শক্তি। নীতিগত মতপার্থক্যের
কারণে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে আবার সাংবাদিকতার অঙ্গনে ফিরে আসেন।
একবার
চায়ের টেবিলে আলাপচারিতার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ
করার পর কোনো ভয় কাজ করেনি? তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এরশাদ আমাকে গুলি করে মারতে
পারতেন, কিন্তু গ্রেপ্তার করার সাহস পেতেন না।’ তার এই বক্তব্যে যেমন
আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ ঘটেছিল, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছিল তার নির্ভীক ব্যক্তিত্ব।
ব্যক্তিগত
জীবনে আনোয়ার জাহিদ ছিলেন বিস্ময়করভাবে নির্লোভ। আজকের বাস্তবতায় অনেক ছোটখাটো
রাজনৈতিক নেতারও রাজধানীতে বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। অথচ একজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য
এবং জাতীয়ভাবে পরিচিত সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও তার ঢাকায় নিজের নামে এক খণ্ড জমিও
ছিল না। জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক কষ্টও তাকে স্পর্শ করেছিল। অসুস্থ হওয়ার পর তার
একমাত্র কন্যা সোমা জাহিদ নিজের সর্বস্ব ব্যয় করে বাবার চিকিৎসার দায়িত্ব পালন
করেন। একদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলে মেয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে
বলেছিলেন, ‘আমার চিকিৎসা করতে গিয়ে মেয়েটা আমার ফকির হয়ে গেল।’ একজন পিতার হৃদয়ের
সেই বেদনা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান।
আমার
সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল
অত্যন্ত উত্তপ্ত। আমরা কয়েকজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী আমাদের বক্তব্যকে আরও গণমুখী ও
গ্রহণযোগ্য করার জন্য একজন জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের সন্ধান করছিলাম। এক
শুভানুধ্যায়ীর পরামর্শে আমরা মহাখালীর শাহীনবাগে তার বাসায় যাই।
রাত
প্রায় ৯টার দিকে পৌঁছেও তাকে পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম, দেখা না করে ফিরব না।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গভীর রাতে তিনি বাড়ি ফিরলেন। এত রাতে কয়েকজন অচেনা তরুণকে
দেখে বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করলেন।
নিজ হাতে চা তৈরি করে বসালেন এবং শুরু করলেন বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও
রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা।
সেদিনের
সেই রাত আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমরা শুনছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম।
কখন যে রাত পেরিয়ে ভোরের সূর্য উঠেছিল, তা বুঝতেই পারিনি। বাংলাদেশের ইতিহাস ও
রাজনীতি সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ ছিল অসাধারণ। মনে হয়েছিল, যেন একজন মানুষের মুখে
একটি জাতির দীর্ঘ ইতিহাস কথা বলছে।
পরবর্তীকালে
বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগ ও আন্দোলনে তার সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তিনি শুধু
বক্তা বা নেতা ছিলেন না; ছিলেন একজন চিন্তাশীল অভিভাবক। মতবিরোধ বা সাংগঠনিক সংকট
দেখা দিলে তিনি ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতেন। একবার আমাদের
সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি গভীর আবেগে বলেছিলেন, ‘তোমরা
যদি নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে না পার, তাহলে বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।’
তার সেই আবেগময় মুহূর্ত আজও চোখে ভাসে।
রাজনৈতিক
জীবনে তিনি নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট ও আন্দোলনের
প্রশ্নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে বৃহত্তর ঐক্যের
প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বারবার তুলে ধরতেন। তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং দূরদর্শিতা
অনেককে প্রভাবিত করেছিল।
তার
ব্যক্তিত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অসাধারণ রসবোধ। একবার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য
দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জুন মাস আমার খুব একটা পছন্দ নয়।’ এরপর ইতিহাসের নানা
ঘটনা উল্লেখ করে তিনি রসিকতার সঙ্গে বলেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য, আমার জন্মও এই জুন
মাসেই।’ তার এই মন্তব্যে উপস্থিত সবাই হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। গাম্ভীর্য ও রসবোধের
এমন সমন্বয় তার বক্তৃতাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।
২০০৮
সালের ১৩ আগস্ট আনোয়ার জাহিদ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তার মৃত্যু তার স্মৃতিকে
মুছে দিতে পারেনি। সাংবাদিকতা, রাজনীতি এবং জাতীয় জীবনে তার অবদান তাকে আজও
স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও
ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হননি; বরং আদর্শ, সততা এবং আত্মমর্যাদাকে জীবনের সবচেয়ে বড়
সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
আজ
জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই মহান মানুষটিকে। নতুন প্রজন্মের
কাছে তার জীবন হতে পারে সততা, সাহস, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য শিক্ষা। বাংলাদেশের
সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসে আনোয়ার জাহিদের নাম উচ্চারিত হবে বারবার।
আধিপত্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধে তার আপসহীন ভূমিকা তাকে দিয়েছে অনন্য মর্যদা। তিনি যুগে যুগে স্মরিত হবেন একজন নিবেদিতপ্রাণ
দেশপ্রেমিক হিসেবে।
মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী