শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস,জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের।
আমি এদেশের জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছি, যার মধ্যে রয়েছে দেশের বৃহত্তম ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। আমরা আইএলও (ILO)-এর আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচার, মর্যাদা, সমতা এবং সবার জন্য শোভন কর্মপরিবেশের প্রতি আমাদের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি।
বাংলাদেশের জন্য
চলতি বছরটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর, ২০২৪ সালে এক গণঅভ্যুত্থানের
মাধ্যমে আমাদের দেশের মানুষ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে, যা ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের
পথ সুগম করে। একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে, সেই নির্বাচনে জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হওয়ার গৌরব আমি অর্জন করেছি। এই দায়িত্বে থেকে সংসদ এবং সংসদের বাইরে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর
আরও জোরালো করতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আজ বাংলাদেশের
শ্রমিকরা আবারও তাদের মৌলিক অধিকার, যেমন- সংগঠন গড়ার স্বাধীনতা এবং যৌথ দরকষাকষির
(কালেক্টিভ বার্গেনিং) অধিকার চর্চা করতে পারছেন। এই পুরো যাত্রায় অবিচল সমর্থনের জন্য
আমরা আইএলও এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
মহাপরিচালকের
প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর এই যুগে কাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বর্তমান
সময়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল
দেশের শ্রমিকদের মতো বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনেও এআই-এর যুগ শুরু হয়ে গেছে। আমরা এর
রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা এবং গভীর ঝুঁকি-উভয় দিকই অনুধাবন করছি। বাংলাদেশে ৭ কোটি ৩০
লাখের বেশি শ্রমশক্তি রয়েছে, যার একটি বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত। আমাদের
অনেক শ্রমিক এখনও অদক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ। যার ফলে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মুখে তারা
বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন।
শ্রমিকদের দৃষ্টিকোণ
থেকে আমরা ইতোমধ্যেই কিছু উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি :
স্বয়ংক্রিয়করণ
বা অটোমেশনের কারণে কিছু কিছু খাতে নারী কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে;
শুরুর দিকের
বা এন্ট্রি-লেভেলের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে;
এবং দক্ষতার ঘাটতি ও অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার কারণে প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে নানামুখী
ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই বাস্তবতাহীনতা একটি মৌলিক সত্যকে সামনে এনে দেয়Ñ অন্তর্ভুক্তিমূলক
নীতিমালা না থাকলে, এআই (AI) বিভিন্ন দেশের মধ্যকার এবং সমাজের অভ্যন্তরীণ বৈষম্যকে
আরও বাড়িয়ে তুলবে।
আমাদের তরুণ
জনগোষ্ঠী এবং প্রবাসী শ্রমিকরা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ। বাংলাদেশ বর্তমানে
প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ কর্মী প্রবাসে পাঠাচ্ছে, যারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে
অবদান রাখছেন। দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় সঠিক বিনিয়োগ করা গেলে, বৈশ্বিক
শ্রমবাজারে তারা আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৩ কোটি ১৬
লাখ তরুণ নিয়ে বাংলাদেশের সামনে এক বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনমিতিক লভ্যাংশ)
অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত
করতে পারে। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই তরুণ, অথচ তাদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই
বর্তমানে বেকার।
উন্নত দেশগুলো
যেভাবে এআই (AI)-কে গ্রহণ করছে, আমাদের প্রেক্ষাপটে হুবহু সেই পথ অনুসরণ করা সম্ভব
নয়। তাই আমরা সামাজিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানাই যেন দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং জ্ঞান
বিনিময়ের জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করা হয়। সেখানে এআই টুলস, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা
বৃদ্ধির সুযোগকে কোনো বিশেষ সুবিধা হিসেবে না দেখে, একটি যৌথ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা
করতে হবেÑ বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। এই কাঠামোটির কাজ হওয়া উচিত :
ডিজিটাল ও দক্ষতার
ব্যবধান দূর করা;
এআই প্রযুক্তিতে
ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা;
নিরাপদ, সুরক্ষিত
এবং দক্ষ অভিবাসন পথ নিশ্চিত করা;
সামাজিক সংলাপের
ভিত্তিতে জাতীয় এআই কৌশল প্রণয়নে দেশগুলোকে সহায়তা করা; এবং শোভন কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য
মজুরির অধিকার রক্ষা করা। প্রতিবেদনে সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর সঠিকভাবে
জোর দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি সীমানা মানে না। তাই কেবল জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ
এর জন্য যথেষ্ট নয়। এই কারণেই আইএলও (ILO)-এর নিজস্ব ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর ভূমিকা এখন
আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক
সহযোগিতার মূল ফোকাস হওয়া উচিতÑ ডিজিটাল অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণে বিনিয়োগ বাড়ানো, ডিজিটাল
সাক্ষরতার অভাব দূর করা, যার মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক ডিজিটাল বৈষম্যও অন্তর্ভুক্ত এবং ভবিষ্যতের
কাজের উপযোগী করে এআই (AI) বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি ও শ্রমশক্তিকে প্রস্তুত করতে সহায়তা
করা।
আন্তর্জাতিক
সহযোগিতার ক্ষেত্রে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে যুবকদের ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ
জোর দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্রিল্যান্সিং জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল এবং
গ্লোবাল আউটসোর্সিং অর্থনীতিতে অন্যতম শীর্ষ দেশ। এই কার্যক্রমের একটি বড় অংশই প্রযুক্তি-নির্ভর
এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একই সাথে, আমাদের সতর্কও থাকতে হবে।
এআই (AI) যেন কখনোই এমন কোনো কাজে ব্যবহার না করা হয়, যা মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে,
সামাজিক অন্যায় বাড়ায় কিংবা সংঘাতের সৃষ্টি করে।
প্লাটফর্ম ইকোনমিতে
(অনলাইন বা অ্যাপ-ভিত্তিক কাজ) শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত কনভেনশনের
আলোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই। প্লাটফর্ম কর্মীরা বৈশ্বিক শ্রমশক্তির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ
অংশ এবং তাদের আরও শক্তিশালী সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও অধিকার প্রয়োজন। প্রবাসী শ্রমিকদের
সুরক্ষা এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
চলমান বৈশ্বিক
সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা শ্রমিকদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকায়।
ফিলিস্তিনের সংঘাত হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে,
ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে আইএলওর উদ্যোগকে আমরা স্বাগত
জানাই।
ত্রিপক্ষীয় সংলাপের
মাধ্যমে শ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ সম্প্রতি দুটি
মৌলিক কনভেনশনসহ তিনটি আইএলও কনভেনশন অনুমোদন (র্যাটিফাই) করেছে। ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের
প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে এবং এখন মাত্র ২০ জন শ্রমিক মিলেই একটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে
পারেন। শ্রমিকদের একজন প্রতিনিধি হিসেবে, শ্রম আইন সংস্কার এবং আইএলও কনভেনশন অনুমোদনের
এই অগ্রগতিতে আমি আশাবাদী।
আমাদের শ্রম
অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, যৌথ দরকষাকষি এবং সামাজিক সংলাপকে আরও শক্তিশালী
করতে হবে। শ্রম অধিকারের সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিÑ উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে
হবে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে অগ্রাধিকার দিলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং শ্রম
ও মানবাধিকারের সামগ্রিক বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই বিষয়ে আমি পুনর্ব্যক্ত করছি
যে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য এবং টেকসই কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশের শ্রমিকরা
ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি
কেবল আমাদের অর্থনীতিতেই অবদান রাখছে না, বরং সামাজিক সংলাপ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।
সংহতি, সংলাপ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের যৌথ অঙ্গীকারকে ধারণ করে আমরা একসাথে এগিয়ে যাই। পথ হয়তো কঠিন হতে পারে, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ন্যায্য। বিশ্বের সব প্রান্তের শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণের জন্য আমাদের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
(সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত আইএলও কনভেনশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে প্রদত্ত ভাষণের সারসংক্ষেপ)
শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস
জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা