× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংকিং লেনদেনে পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স’ কথাটি বাংলায় ‘যথার্থ লেনদেন’ বা নিয়মমাফিক লেনদেন হিসেবে সাধারণত ব্যবহৃত হয়।

তবে হোল্ডার ইন ডিউ কোর্সের মতো পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সও জটিল একটি বিষয়, যার যথার্থ ব্যাখ্যা কষ্টসাধ্য। কেননা পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স মূলত হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন বা নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের একটি অংশ। আর্থিক লেনদেন, বিশেষ করে ব্যাংকিং লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মূলত ব্যাংকারদের জন্য পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স জানা অপরিহার্য হলেও, সাধারণ মানুষের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যারা কোনো প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স বা হিসাব বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন, বিভিন্ন প্রকার লেনদেন নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে চেক ইস্যু বা গ্রহণ করেন, অথবা ব্যাংকের সাথে লেনদেন করেন, তাদের বিষয়টি জানা থাকা প্রয়োজন। তবে পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স সম্পর্কে ব্যাংকারদের জানার সাথে অন্য সাধারণ মানুষের জানার ক্ষেত্রে একটি পার্থক্য আছে। ব্যাংকে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত এই পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সের অধীনেই দেওয়া আছে। যারা ব্যাংকে কাজ করেন, বিশেষ করে ক্যাশ ডিপার্টমেন্ট বা নগদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের প্রতিনিয়ত আর্থিক লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হয়, অর্থাৎ হয় নগদ অর্থ প্রদান করতে হয়, অথবা নগদ অর্থ জমা নিতে হয়। ব্যাংকে নগদ অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স মেনে লেনদেনটি সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিনিয়ত ব্যাংকাররা নগদ লেনদেন সম্পন্ন করলেও, অধিকাংশরাই ভালোভাবে জানে না যে, পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স আসলে কী এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়। এজন্য অবশ্য ব্যাংকারদের দায়ী করে লাভ নেই। কেননা এই আইনটি এমনিতেই বেশ কঠিন। তা ছাড়া বিষয়টির ওপর ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগও সীমিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ব্যাংকারের সাথে কথা বলেছি এবং তাদের অনেকে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কথা বলার পর বুঝতে পেরেছি যে অধিকাংশ ব্যাংকারের এই আইন সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই।

১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ১০ ধারায় পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সের সংজ্ঞা দেওয়া আছে। সেই ধারায় বলা হয়েছে, ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স হচ্ছে সেই পেমেন্ট, যা প্রদান করা হয় একটি চেকে আপাতদৃষ্টিতে যেভাবে লেখা আছে, সে অনুযায়ী কোনোরকম অবহেলা না করে এবং পুরোপুরি সরল বিশ্বাসে। চেকের অর্থ প্রদান করা হবে সেই ব্যক্তিকে, যার কাছে চেকটা থাকে। এবং পেমেন্ট করার সময় এমন কোনো অবস্থা বা পরিস্থিতির উদ্রেক হয়নি, যা থেকে মনে হতে পারে যে সেই ব্যক্তি চেকের অর্থ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নন। (পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স মিনস, পেমেন্ট ইন একরডেন্স উইথ দ্য আপারেন্ট টেনর অব দ্যা ইনস্ট্রুমেন্ট ইন গুড ফেইথ অ্যান্ড উইথআউট নেগ্ললিজেন্স টু এ পারসন, হু ইজ ইন পজেশন দেয়ার অব আন্ডার সারক্যমসট্যান্সেস, হুইছ ডু নট অ্যাফোর্ড রিজেনবল গ্রাউন্ড ফর বিলিভিং দ্যাট হি ইজ নট এনটাইটেলড টু রিসিভ দ্য পেমেন্ট অব দ্য অ্যামাউন্ট ম্রনশনড দেয়ারইন।’

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ১০ ধারায় ‘পেমেন্ট-ইন-ডিউ-কোর্সের’ সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে সুনির্দিষ্ট চারটি শর্ত আবশ্যিক পরিপালনের বাধ্যবাধকতা লক্ষ করা যায়। প্রথমত, চেকের অর্থ প্রদান করতে হবে চেকে আপাতদৃষ্টিতে যেভাবে লেখা থাকবে, সে অনুযায়ী। দ্বিতীয়ত, চেকের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনোরকম শৈথিল্য বা অবহেলা দেখানো যাবে না এবং পেমেন্ট করতে হবে সরল বিশ্বাসে। তৃতীয়ত, যে ব্যক্তির কাছে চেকটি থাকবে, অর্থাৎ যিনি চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করবেন, তাকেই চেকের অর্থ প্রদান করতে হবে। এবং চতুর্থত, চেকের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে এমন কোনোরকম অবস্থা বা পরিস্থিতির ইঙ্গিত থাকবে না, যাতে ব্যাংকারের মনে ধারণা হতে পারে যে, সে ব্যক্তি চেকের অর্থ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়।

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টে প্রদত্ত সংজ্ঞা থেকে কি খুব সহজে বোঝা সম্ভব, কীভাবে চেকের অর্থ প্রদান করলে সেটা ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সের’ পর্যায়ে পড়বে? এমনকি প্রদত্ত সংজ্ঞার আলোকে ওপরে যে চারটি শর্ত পরিপালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখান থেকেও তো একজন সাধারণ ব্যাংকারের পক্ষে জানা সম্ভব নয় কীভাবে যথাযথ শর্ত মেনে চেকের অর্থ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব। এটা নিশ্চিত করার জন্য তিনটি স্তরে কিছু বিষয় এবং শর্ত মেনে চলার প্রয়োজন এবং সেগুলো হচ্ছে (১) চেক বা ইনস্ট্রুমেন্ট, (২) ব্যাংক হিসাব বা অ্যাকাঊন্ট এবং (৩) কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত। একটি চেকের কিছু অত্যাবশ্যিক বৈশিষ্ট্য বা ফিচার থাক, যা মেনে অর্থ প্রদান করতে হয়। এই ফিচারগুলো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ছাপানো নির্ধারিত চেক হতে হবে, তারিখ, প্রাপক, টাকার পরিমাণ সংখ্যা এবং কথায় এক হতে হবে, বাহক বা অর্ডার অথবা দাগকাটা চেক কি না, দাগকাটা চেক হলে কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে কি না এবং হিসাবধারীর স্বাক্ষর। একটি চেক হাতে পাওয়া মাত্র একজন ব্যাংকারকে চেকের এই বিষয়গুলো ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। এর পরে আসে হিসাব সংক্রান্ত। যে গ্রাহক চেকটা ইস্যু করবেন, হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। এরপর হিসাবে কোনোরকম বিধিনিষেধ আছে কি না, তাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পর যে বিষয়টি আসে, তা হচ্ছে কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত। অর্থাৎ চেকে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ, সেই ব্যক্তির অতীত লেনদেনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, গ্রাহকের ট্রানজেকশন অ্যাক্টিভিটি প্রোফাইলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

চেকের অর্থ প্রদানের উদ্দেশ্যে এই তিনটি স্তরের যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে কোনোরকম শৈথিল্য বা গাফিলতির পরিচয় দেওয়া যাবে না। এই কাজটাই সবচেয়ে বেশি কঠিন, কেননা অবহেলার বিষয়টি প্রমাণ করা বেশ কষ্টকর। তা ছাড়া পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই শর্ত পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। যেমন, যে গ্রাহক প্রতিনিয়ত ব্যাংক থেকে চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন, তার স্বাক্ষর ব্যাংকারের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে যায়। ফলে সেই ব্যাংকার চেকের স্বাক্ষর দেখে যদি চিনে ফেলতে পারে, তখন সে আর ব্যাংকের কাছ রক্ষিত স্বাক্ষর কার্ড না দেখেই চেক পাস করে দিতে পারে। এই ধরনের কাজই ব্যাংকারদের অবহেলা বা গাফিলতির পর্যায়ে পড়ে। চেকে সঠিক স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকার যদি স্বাক্ষর কার্ডের সাথে না মিলিয়ে চেকের অর্থ প্রদান করে, তাহলে সেটি গাফিলতি বা অবহেলার পর্যায়ে পড়বে এবং সেই চেকের অর্থ পরিশোধ ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সের’ পর্যায়ে পড়বে না। পক্ষান্তরে একটি চেকে যদি গ্রাহকের যথাযথ স্বাক্ষর না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকার যদি স্বাক্ষর কার্ডের সাথে মিলিয়ে দেখে চেকের অর্থ পরিশোধ করেন, তাহলে সেটি আর অবহেলা বা গাফিলতির পর্যায়ে পড়বে না এবং সেই চেকের অর্থ পরিশোধ ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সের’ মর্যাদা লাভ করবে।

এতকিছু ঠিকঠাক মেলে চলার পর আরও একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। চেকের অর্থ পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনোরকম অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় কি না, কোনো প্রশ্ন মনে আসে কি না, অতিরিক্ত তথ্যের প্রয়োজন আছে কি না, সেই বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা কোথাও কোনো প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকলে, সেই প্রশ্ন করেই নিশ্চিত হয়ে চেকের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। চেক পেমেন্টের এই ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে মেনে চেকের অর্থ পরিশোধ করার অর্থই হচ্ছে ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স’। অনেকেই ভাবতে পারেন যে, বিষয়টি লম্বা একটি প্রক্রিয়া, যা মেনে চেকের অর্থ প্রদান করতে গেলে অনেক সময় লাগবে, যা গ্রাহকদের অসন্তুষ্টির কারণ ঘটাবে। কথা সত্য। লেখার মাধ্যমে বোঝাতে গেলে এরকম দীর্ঘই মনে হবে। এমনকি যারা নতুন ব্যাংকার, তাদের কাছেও বেশ জটিল এবং দীর্ঘ পদ্ধতি মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রতিনিয়ত অনুশীলন করতে করতে পদক্ষেপগুলো এতই চিরচেনা সহজ হয়ে যায়, তাতে মুহূর্তের মধ্যে এই পদক্ষেপগুলো খুব সহজেই পরিপালন করা সম্ভব।

এতসব নিয়ম মেনে চেকের অর্থ পরিশোধ করলেই যে সেটা ‘পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্স’ হয়ে যাবে, তার শতভাগ নিশ্চয়তা কখনোই থাকে না। ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছেÑ চেক পেমেন্টের দুয়েকটি শর্ত পরিপালন করা না হলেও, যদি যার টাকা তার কাছে বা তার নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে যায়, তাহলে কোনো সমস্যা হয় না এবং যথার্থ লেনদেন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পক্ষান্তরে চেক পেমেন্টের সব শর্ত ঠিক থাকা সত্ত্বেও যদি যার টাকা তার কাছে বা তার নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে না যায়, তখনই বড় সমস্যা এবং সেখানে যথার্থ লেনদেন নিশ্চিত করা হয়নি বলে দাবি করা হতে পারে। বিষয়টি একটু জটিল বিধায় সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। তবে, সংক্ষেপে বলা যায়, ব্যাংকিং লেনদেনে ব্যাংকার যদি সতর্কতা অবলম্বন করে আইন মেনে তা সম্পন্ন করেন, তাহলে তাকে আইনি জটিলতায় পড়তে হয় না।



নিরঞ্জন রায়

সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা


 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা