মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডিজিটাল মার্কেটিং বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ব্যবসা, বাণিজ্য ও সেবা খাত দ্রুত ডিজিটাল প্লাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে দেশের অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ডিজিটাল মার্কেটিং শুধু পণ্যের প্রচারণার মাধ্যম নয়; এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থনীতির অন্যতম
ভিত্তি। আগে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার জন্য টেলিভিশন, পত্রিকা বা বিল বোর্ডে বিপুল ব্যয় করতে হতো। এখন ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, ইনস্টাগ্রাম এবং
টিকটকের মতো ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে অল্প খরচে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানো
সম্ভব হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পণ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন। বিশেষ করে
নারীদের অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরে বসেই তারা পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন সেবা বিক্রি করছেন-
যা পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আগে ব্যবসা সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট এলাকা বা শহরের মধ্যে কিন্তু
এখন একজন উদ্যোক্তা দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনের মাধ্যমে সারা দেশে, এমন
কি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন।
আমাদের দেশে অনলাইন বাণিজ্য খাত গত এক দশকে যে গতিতে
বিস্তার লাভ করেছে,
তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ
সূচক। স্মার্টফোনের বিস্তার, মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল
পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণÑ সবকিছু মিলিয়ে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স আজ একটি বহু বিলিয়ন
ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প খাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫
সালে বাংলাদেশের অনলাইন বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৬০ থেকে ৮০ হাজার কোটি
টাকায়
এবং এটি প্রতিবছর ২০-২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় ৭০-৭৫
মিলিয়ন ডিজিটাল ক্রেতার অংশগ্রহণ এই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
তবে এই উল্লম্ফনের মধ্যেই একটি মৌলিক দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট
হয়ে উঠছেÑ আস্থার সংকট এবং পণ্যের গুণগতমান নিয়ে অনিশ্চয়তা। বাজারের আকার বাড়ছে, কিন্তু
সেই অনুপাতে সুশাসন,
মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী হচ্ছে
না। ফলে অনলাইন বাণিজ্য আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে
অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি।
বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার সংখ্যা তিন লক্ষাধিক হলেও
নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক
ব্যবসা কার্যত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে
ফেসবুকভিত্তিক এফ-কমার্স, যা বর্তমানে বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে আছেÑ সেখানে বিক্রেতার
পরিচয়, পণ্যের উৎস,
কিংবা লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর কোনো
কাঠামো নেই।
এই অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার
লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ বাজারের একটি বড় অংশ ‘ইনফরমাল
ইকোনমি’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কর আদায়, ভোক্তা সুরক্ষা কিংবা
মান নিয়ন্ত্রণ কার্যত অনুপস্থিত। ফলাফল হিসেবে প্রতারণা, নিম্নমানের
পণ্য সরবরাহ এবং লেনদেন জটিলতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের অনলাইন বাণিজ্যে আস্থার সংকটের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে
একাধিক উচ্চ প্রোফাইল ই-কমার্স কেলেঙ্কারি। শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, দীর্ঘদিন
পণ্য সরবরাহ না করা,
কিংবা গ্রাহকের অর্থ আটকে রাখা- এসব ঘটনা ভোক্তাদের মধ্যে গভীর
অনাস্থা তৈরি করেছে। হাজার হাজার ভোক্তা এখনও তাদের অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন। বড়
বড় এই কেলেঙ্কারির বাইরেও একটি নীরব সংকট প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছেÑ দৈনন্দিন প্রতারণা।
অনলাইনে প্রদর্শিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তব পণ্যের অমিল, নিম্নমানের বা নকল পণ্য
সরবরাহ, অর্ডারকৃত পণ্যের পরিবর্তে অন্য পণ্য পাঠানো কিংবা
রিটার্ন ও রিফান্ডে অযৌক্তিক জটিলতাÑ এসব অভিজ্ঞতা এখন অসংখ্য ক্রেতার কাছে পরিচিত
বাস্তবতা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার ভোক্তা
অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ করছেন এবং এদের একটি বড় অংশ সামাজিক
মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা থেকে উদ্ভূত। এতে একটি সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে, ‘অনলাইনে কেনাকাটা
মানেই ঝুঁকি’Ñ যা পুরো খাতের জন্য একটি বড় বাধা। বর্তমানে বাজারে পণ্য বিক্রির
ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ বা সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে
প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফলে নিম্নমানের, নকল বা বিভ্রান্তিকর পণ্য
সহজেই বাজারে প্রবেশ করছে। এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে :
১. নিম্নমানের আন্তর্জাতিক সোর্সিং (বিশেষত সস্তা আমদানিকৃত
পণ্য)।
২. ড্রপ-শিপিংভিত্তিক ব্যবসা, যেখানে বিক্রেতার
নিজস্ব স্টক বা নিয়ন্ত্রণ নেই।
৩. পণ্যের যাচাই-বাছাই ছাড়া বিজ্ঞাপন ও বিক্রয়।
৪. মান নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, ফলে ক্রেতা একটি
ছবিভিত্তিক প্রত্যাশা তৈরি করেন, কিন্তু বাস্তবে যে পণ্যটি পান তা সেই
প্রত্যাশা পূরণ করে না। এই ব্যবধানই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও এর
কার্যকর প্রয়োগ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, অগ্রিম
অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাÑ এসব
উদ্যোগ আংশিকভাবে নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত। বিশেষ
করে সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসাগুলো এখনও প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে
বাজারে একটি ‘অসম প্রতিযোগিতা’ তৈরি হয়েছেÑ যেখানে নিবন্ধিত ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে
অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। ফলে নিম্নমানের, নকল বা বিভ্রান্তিকর পণ্য সহজেই বাজারে প্রবেশ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি
থেকে উত্তরণের জন্য কেবল তাত্ত্বিক নীতিমালা নয়, বরং
বাস্তবভিত্তিক এবং প্রয়োগযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একটি শক্ত রেগুলেটরি
কাঠামো খুবই জরুরি, যাদের কর্ম বিস্তৃতি নিম্নরূপ হতে পারেÑ
প্রথমত, বাধ্যতামূলক প্রোডাক্ট
স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশন চালু করা জরুরি। নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির পণ্যের জন্য
(যেমন ইলেকট্রনিকস, কসমেটিকস, খাদ্যপণ্য)
মান নির্ধারণ করে তা যাচাই ছাড়া অনলাইনে বিক্রির অনুমতি না দেওয়া। এতে নিম্নমানের
পণ্য সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রোডাক্ট
ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি
পণ্যের উৎস, আমদানিকারক বা উৎপাদক তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত
থাকবে। এতে ভোক্তা সহজেই পণ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারবেন।
তৃতীয়ত, অনলাইন মার্কেট প্লেসগুলোর
জন্য কোয়ালিটি কমপ্লায়েন্স বাধ্যতামূলক করা। অর্থাৎ যেসব প্লাটফর্মে পণ্য বিক্রি
হবে, তাদের ওপর দায়িত্ব থাকবে বিক্রেতার পণ্যের মান যাচাই
করা এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
চতুর্থত, রিটার্ন ও রিফান্ড
নীতিমালা আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পণ্যের গুণগতমান প্রত্যাশিত না
হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন ও রিফান্ড নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক
ব্যবসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। নিবন্ধন ছাড়া কোনো ধরনের বাণিজ্যিক
কার্যক্রম পরিচালনা করতে না দেওয়া হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে।
তবে শুধু সরকার বা ব্যবসার ওপর দায় চাপিয়ে এই সংকট সমাধান
সম্ভব নয়। ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য কেনার
প্রবণতা, যাচাই ছাড়া অগ্রিম অর্থ প্রদান কিংবা অপরিচিত বিক্রেতার ওপর
অতিরিক্ত নির্ভরতাÑ এসব আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। একই
সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি
দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে, যেখানে স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে আস্থা ও ব্র্যান্ডমূল্য
বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় প্রতারণা করে
দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সুস্থ
বাজার গড়ে তুলতে হলে সৎ ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে এবং মান বজায় রাখার
প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স নিঃসন্দেহে
ভবিষ্যতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে
বাস্তবে রূপ দিতে হলে আস্থার সংকট দূর করা অপরিহার্য। সঠিক নীতি, কার্যকর প্রয়োগ এবং সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই খাতকে একটি টেকসই ও
বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্মে রূপান্তর করা সম্ভব। সময় এখন
কেবল প্রসারের নয়, বরং সুশাসনের। কারণ নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃদ্ধি
যত দ্রুত আসে, তত দ্রুতই ভেঙে পড়তে পারে। আর সুশাসিত
প্রবৃদ্ধিই পারে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং আস্থাভিত্তিক
ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে। যদি সময়মতো কার্যকর রেগুলেটরি কাঠামো প্রবর্তন এবং
প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই খাত দেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী
ও টেকসই ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধি একসময়
আস্থার সংকটে থমকে যাবে।
ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করেনি, বরং কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথকে ত্বরান্বিত করেছে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনশক্তি এবং আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এখানে সংখ্যায় নয়, গুণে ও বিশ্বাসে উন্নয়ন কেবল এই নীতিই হতে পারে বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশক।
মো. ইলিয়াস হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা