× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিকল্পনায় লিঙ্গবৈষম্য ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৫২ মিনিট আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

২০২৬ সালের একটি মেঘলা সন্ধ্যা। ঢাকার একটি ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন কর্মজীবী নারী। তাকে বাস ধরতে হবে, কিন্তু বাসের পাদানিতে ওঠার জন্য যে উচ্চতা, তা তার শাড়িতে বা শারীরিক গঠনে মানানসই নয়। ভিড়ের মাঝে বাসের হাতলটি ধরতে গিয়ে দেখলেন সেটি তার উচ্চতার তুলনায় অনেক উঁচুতে। এমনও দৃশমান হয়, আশপাশে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই, আর যে ফুটপাত দিয়ে তাকে যেতে হবে, সেখানে নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। এই যে প্রতিদিনের ছোট ছোট বাধা, এগুলো কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি আমাদের শহরের প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথর কেবল পুরুষদের শারীরিক গঠন ও যাতায়াতের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা? এই স্থাপত্যের অদূরদর্শিতা কি নারীর সামাজিক চলাফেরাকে নিঃশব্দে বাধাগ্রস্ত করছে? আমরা কি তবে এমন এক যান্ত্রিক শহরে বাস করছি, যা নারীকে স্বাগত জানানোর বদলে প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যান করছে?

আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নগর পরিকল্পনা সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর ২০২৬ সালের নগর উন্নয়ন প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, বিশ্বের অধিকাংশ শহরের পরিকাঠামো ‘জেন্ডার-নিউট্রাল’ বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়। আমরা বিভিন্ন গবেষণা থেকে বুঝতে পারি যে, পাবলিক টয়লেটের অভাব এবং বাস স্টপেজের নিরাপত্তাহীনতার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীদের ঘরের বাইরে কর্মঘণ্টা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২৫% কম।

২০২৬ সালের ‘জেন্ডার রেসপনসিভ আরবান ডিজাইন ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে নারীদের জন্য মানসম্মত পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১০%। পরিসংখ্যান বলছে, বাসের হাতল এবং সিটের উচ্চতা দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের গড় উচ্চতার (৫ ফুট ২ ইঞ্চি) তুলনায় গড়ে ৫ ইঞ্চি বেশি উঁচুতে সেট করা। আমরা বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্লেষণ থেকে দেখি যে, শহরের অন্ধকার গলি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার অভাব নারীর চলাফেরাকে সীমিত করে দিচ্ছে। সোর্স বলছে, নিরাপদ যাতায়াতের অভাবে বছরে হাজার হাজার নারী উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সুযোগ বিসর্জন দিচ্ছেন। স্থাপত্যের এই বৈষম্য কি তবে শহরকে কেবল এক পাক্ষিক শক্তির প্রতীকে পরিণত করছে না?

আমরা সমাজতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যবিদদের বিশ্লেষণ থেকে বুঝি যে, শহরের নকশা কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়। আমরা বিভিন্ন টেক-এথিক্স রিপোর্ট থেকে দেখি যে, যখন কোনো স্থপতি কেবল নিজের (পুরুষ) অভিজ্ঞতা থেকে শহরের ড্রেন, রাস্তা বা সিঁড়ি ডিজাইন করেন, তখন তিনি অজান্তেই অর্ধেক জনসংখ্যাকে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেন।

বাস্তবিক চিত্র হলো, ২০২৬ সালের এই হাই-টেক যুগেও আমাদের শহরের পার্কগুলো মা ও শিশুদের জন্য ‘ফ্রেন্ডলি’ নয়। স্তন্যদানের জন্য কোনো নিরাপদ কক্ষ বা হুইলচেয়ার নিয়ে নারীদের চলাচলের উপযুক্ত র‍্যাম্প অধিকাংশ ভবনে অনুপস্থিত। আমরা বিভিন্ন ক্যারিয়ার সমীক্ষা থেকে জানি যে, নারী যখন একটি শহরকে ‘বিপজ্জনক’ বা ‘অস্বস্তিকর’ মনে করেন, তখন তিনি ঘরে ফিরে আসাকেই শ্রেয় মনে করেন। এটি কি কোনো অদৃশ্য ষড়যন্ত্র নয়, যা নারীকে জনজীবন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? স্থাপত্য যখন নারীর প্রয়োজন বোঝে না, তখন শহর হয়ে ওঠে এক বিশাল কারাগার।


বাসের হাতল থেকে পাবলিক টয়লেট

আমরা বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল ও নগর পরিকল্পনা ডেটা থেকে জানতে পারি যে, শহরের ভৌত অবকাঠামো সরাসরি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। আমরা জানি যে, পর্যাপ্ত আলোহীন ফুটপাত বা নির্জন সাবওয়েগুলো নারীর মনে অবিরত এক ধরনের ভীতির জন্ম দেয়। আমরা ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেখছি, আধুনিক স্থাপত্য মানে কেবল কাচের বিশাল ভবন নয়, বরং সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তার উপস্থিতি।

এটি কেবল একটি ডিজাইনের ভুল নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত অবজ্ঞা। আমরা আমাদের শহরকে প্রযুক্তির কাছে ‘ইজারা’ দিয়ে দিয়েছি, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো ভুলে গেছি। আমরা প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট দেখি, কিন্তু কয়টি প্রজেক্টে নারীর পিরিয়ড-কালীন স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে পাবলিক স্যানিটেশন রাখা হয়? এই যে স্থাপত্যের লিঙ্গবৈষম্য, তা আসলে আমাদের সভ্যতাকে একটি ‘পুরুষালি’ অহংকারে রূপ দিচ্ছে। শহর কি কেবল একপাক্ষিক শক্তির প্রতীক হয়েই থাকবে?

 

সৃজনশীলতার সংকট

আমরা বিভিন্ন নগর কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে বুঝি যে, জেন্ডার-বাজেটিং বা লিঙ্গ-ভিত্তিক বরাদ্দ এখনও আমাদের পরিকল্পনায় গৌণ। আমরা জানি যে, যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকে, তখন স্থাপত্যে নারীর সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হয় না।

আমরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীক্ষায় দেখি যে, এই ‘অদৃশ্য স্থপতি’ বা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আসলে এক ধরনের ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল বিভাজন তৈরি করছে। বাংলাদেশে কেন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে নারী হয়রানি বাড়ছেÑ তার এক বড় কারণ হলো বাসের ডিজাইন এবং ভিড় ব্যবস্থাপনায় নারীর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা না করা। ২০২৬ সালের ডেটা বলছে, আমরা প্রযুক্তি আর গ্ল্যামারকে বিশ্বাস করে আমাদের অর্ধেক জনশক্তির সামাজিক নিরাপত্তাকে বাজি ধরছি। শহরের নকশা কি তবে নারীকে ঘরবন্দি রাখার এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কাজ করছে না?

 

প্রযুক্তির স্বর্ণখাঁচা বনাম অন্তর্ভুক্তিমূলক শহর

প্রযুক্তি আমাদের বলছে জগৎ এখন ‘স্মার্ট সিটি’র দিকে যাচ্ছে। এআই (AI) আমাদের বলছে, সে ট্রাফিক কন্ট্রোল করবে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি কি পারবে আমাদের সেই ‘বোধ’ বা ‘সহমর্মিতা’ ফিরিয়ে দিতে, যা একজন গর্ভবতী নারীর জন্য ফুটপাতে বসার জায়গা নিশ্চিত করে? প্রযুক্তি আমাদের বড় রাস্তা দিতে পারে, কিন্তু আমাদের ‘প্রজ্ঞা’ বা ‘ন্যায়বিচার’ ফিরিয়ে দিতে পারে না।

আমাদের প্রজ্ঞা আজ আমাদের বলছে, খাঁচা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত খাঁচাই যদি সেখানে ‘চলাফেরার সার্বভৌমত্ব’ না থাকে। নিজের মুখোমুখি হওয়া মানে হলো এই স্থাপত্যগত বৈষম্যের দায় স্বীকার করা। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে শৃঙ্খলার পাঠ দেয়, তা যেন কেবল পাঠ্যবইয়ে না থেকে আমাদের নগর পরিকল্পনার প্রতিটি ইটে প্রতিফলিত হয়। ২০২৬ সালের এই সংকটে আমাদের প্রজ্ঞা বলছে, সস্তা নগরায়ণের চেয়ে ‘জেন্ডার-রেসপনসিভ’ স্থাপত্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রগতি।

 

যখন শহর হবে কেবল একদিকের আয়না

কল্পনা করুন, ২০৩০ সালের একটি সন্ধ্যা। আপনার মেয়ে বা বোন শহর থেকে ফিরছেন, কিন্তু পুরো রাস্তায় তিনি একটি নিরাপদ টয়লেট খুঁজে পেলেন না। তিনি অন্ধকার একটি গলিতে একা দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছেন কারণ সেখানে কোনো সড়ক বাতি নেই। তিনি বাসে উঠতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলেন কারণ ফুটপাতটি বাসের উচ্চতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই যে এক ভয়াবহ শূন্যতা, যেখানে আপনার প্রিয় মানুষটি নিজের শহরেই নিজেকে পরবাসী মনে করছেন, তা কি আপনার বিবেককে নাড়া দেয় না? আমরা কি সত্যিই একটি আধুনিক স্মার্ট সিটি গড়তে চাই, নাকি কেবল পুরুষের জন্য একটি বিশাল খেলার মাঠ তৈরি করছি?

 

এক নতুন সজীবতার প্রতীক্ষা

২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের একটি রূঢ় সত্য বুঝতে হবেÑ পৃথিবীর কোনো ‘মেগা প্রজেক্ট’ আপনাকে সফল বানাতে পারবে না যদি না আপনার শহরের নকশায় আপনার মা, বোন বা স্ত্রীর স্বাচ্ছন্দ্য থাকে। ‘দ্য গোল্ডেন কেজ’ বা এই যান্ত্রিক সভ্যতার মায়া আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে যে, ‘চওড়া রাস্তা মানেই উন্নয়ন।’ কিন্তু সত্য হলো, আপনার মানবিকতাই আপনার আসল স্থাপত্য।

শহরের এই লিঙ্গবৈষম্য আসলে এক ধরনের সামাজিক দেউলিয়াত্ব। আপনি যদি কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্য শহর ডিজাইন করেন, তবে আপনি কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন না। প্রজ্ঞা কেবল এআই-এর ডেটাবেজে নেই, প্রজ্ঞা আছে একটি শহরের প্রতিটি কোণকে নারীর জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার সাহসে। মনে রাখবেন, খাঁচা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত খাঁচাই; আর প্রাণের আসল সৌন্দর্য তার ভয়হীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চলাফেরায়। আসুন আমরা সাশ্রয়ী হই মেকি প্রদর্শনীতে, আর ইনভেস্ট করি আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধায়। পৃথিবী আপনাকে আপনার ‘উড়ালের উচ্চতা’ দেখে নয়, বরং আপনার ‘শহরের নিরাপত্তা’ আর ‘প্রজ্ঞা’ দেখে বিচার করবে।

শহরের আগামী পরিকল্পনায় একজন নারীর চোখে জগৎকে দেখার চেষ্টা করুন। সেই সংবেদনশীলতাই হোক আগামীর পৃথিবীতে আপনার শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা।


ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা