ভূঁইয়া শফি। ফাইল ছবি
সকাল আটটার কিছু আগে বা পরে। যে সময়ে শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখর হওয়ার কথা স্কুল প্রাঙ্গণ, ঠিক তখনই ন্যক্কারজনক হামলার সাক্ষী হয় কুমিল্লার তিতাস উপজেলার একটি স্কুল। মঙ্গলবারের ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির এক ছাত্রীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ করে এক দুর্বৃত্ত।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য, অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনাটি আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তাকে একদল বখাটে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। আরও মারাত্মক বিষয় হলো অ্যাসিড ছোড়ার মাত্র এক দিন আগে তাকে ছুরিকাঘাত করেছিল অ্যাসিড ছোড়া যুবক ও তার সঙ্গীরা।
এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। সোমবারে কিশোরীটিকে যারা আক্রমণ করল, ঠিক পরের দিন তারা কীভাবে ছাত্রীটির গায়ে অ্যাসিড মারার সাহস দেখাল? ঘটনার দিনই কেন অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হলো না? কেন স্কুল কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রশাসন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিল না?
ছুরিকাঘাতের মতো গুরুতর একটি অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীরা যখন নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায়, তখন তারা অবধারিতভাবেই আরও বড় অপরাধ করার সাহস পায়। তিতাসের ঘটনাটি যেন তেমন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
অ্যাসিড নিক্ষেপ কোনো সাধারণ আঘাত নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বকে মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা। বাংলাদেশে অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন অত্যন্ত কঠোর। একসময় দেশে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা বাড়লে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রচারের ফলে এর হার অনেকটা কমে এসেছিল, কিন্তু তিতাসের ঘটনাটি যেন এ সন্ত্রাসের নতুন একটি দিক উন্মোচন করল।
প্রথমে উত্ত্যক্ত করা। তারপর শারীরিক আক্রমণ। তাতেও বন্ধ হয়নি দুর্বৃত্তপনা, যার শেষটা হয়েছে অ্যাসিড ছোড়ার মধ্য দিয়ে।
এসব অপরাধের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলাজনিত ব্যর্থতা। যেকোনো অপরাধের বিষয়ে সমাজের মানুষ সোচ্চার হলে রাষ্ট্র তাতে নজর দিতে বাধ্য হয়। উত্ত্যক্ত করার মতো ঘটনাগুলোতে কোনো এলাকা বা জেলায় বড় ধরনের প্রতিবাদ হলে তার ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশজুড়ে। এতে করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে এ বিষয়ে নজর দিতে হয়।
তিতাসের ঘটনার ক্ষেত্রে যদি শুরুতে উত্ত্যক্তের জোর প্রতিবাদ হতো কিংবা অন্ততপক্ষে ছাত্রীকে আক্রমণের পর অভিযুক্তকে ধরা হতো, তাহলে অ্যাসিড সন্ত্রাসের আরেকটি বিভীষিকা শিরোনাম হতো না সংবাদের।
এ থেকে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, তিতাসে অ্যাসিড সন্ত্রাস কি আমাদের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধীর প্রতিক্রিয়ার ফসল? এটি কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সমাজের ঘুমন্ত অবস্থার প্রতিক্রিয়া? অভিযুক্তের বিচার প্রক্রিয়ায় লাগা সময়ই হয়তো দেবে এ দুই প্রশ্নের উত্তর।
লেখক: সাংবাদিক