মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সম্প্রতি নাগরিক প্লাটফর্ম ‘দক্ষিণের জানালা’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমার নিজেরই মনে হয় ঢাকা শহরে থাকব না।
ঢাকা শহরকে আর বাসযোগ্য মনে হয় না।’ মির্জা আলমগীর আরও বলেছেন, ‘ঘর থেকে বের হলেই যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, সেটাও দূষিত। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পর প্রকল্প চলছে এই ঢাকা নগরের জন্য, কিন্তু নাগরিকরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছে, সেই বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা দরকার। এসবের যারা নীতিনির্ধারণ করছেন, শহর পরিচালনা করছেন তাদেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’ রবিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বসবাসের অযোগ্য কেন ঢাকা’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বক্তব্যের মর্মকথা। মন্ত্রী মহোদয়ের এসব উক্তি যথার্থতা নিয়ে কারোরই দ্বিমত থাকার কথা নয়। তিনি রাজধানীবাসীর মনের কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বৈশ্বিক প্রতিবেদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর। একই সঙ্গেও সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরও বটে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২৩ হাজার থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ জনের বাস এই নগরীতে। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধার কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসছেন। ফলে যানজট হয়ে উফঠছে নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক সুবিধার সংকট ঢাকাকে ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ঢাকার পরিবেশ সংকটকে করে তুলেছে আরও তীব্র। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দাবদাহের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় বেশি অনুভূত হয়।
এ কথা সত্য যে, বিশ্বের দ্রুততম
নগরায়ণের উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে ঢাকা গত কয়েক দশকে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি,
শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের বড় একটি মাশুল
দিতে হচ্ছে পরিবেশকে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা
‘আইকিউএয়ার’-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রায়ই ঢাকাকে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত বায়ুর শহর
হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এই শহরের বাতাসে অতিসূক্ষ্ম কণা বা পিএম ২.৫-এর
মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে।
প্রাণঘাতী এই বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হলোÑ অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, শি্ল্প-কারখানার
বর্জ্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং শহরের চারপাশের শত শত অবৈধ ইটভাটা।
এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে নির্মাণ এলাকায় শতভাগ
ধূলিনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, ঢাকা ও এর আশপাশের সনাতন পদ্ধতির
ক্ষতিকর ইটভাটাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে আধুনিক ‘গ্রিন ব্রিকস’ বা পরিবেশবান্ধব
ব্লক ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন,
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের পরিধি বৃদ্ধি করা গেলে
ঢাকার বাতাস পুনরায় প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার উপযোগী হয়ে উঠবে।
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, একটি আদর্শ ও
স্বাস্থ্যকর শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি বা সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন।
অথচ ঢাকার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং
সবুজের এই ঘাটতি মেটাতে নগরব্যাপী ‘নগর বনায়ন’ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। ঢাকার
প্রতিটি ফাঁকা জায়গা, সড়কদ্বীপ এবং সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে বাধ্যতামূলক
ছাদকৃষি বা সবুজায়ন নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত ছাদবাগান
ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে, যা
সামগ্রিকভাবে পুরো শহরের উত্তপ্ত আবহাওয়াকে শীতল করতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
দিক হলো নদী ও জলাশয়ের ধ্বংস। একসময় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী
ঢাকার প্রাণ ছিল। বর্তমানে শিল্পবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং গৃহস্থালি
বর্জ্যের কারণে এসব নদী মারাত্মকভাবে দূষিত। অনেক স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ
বাধাগ্রস্ত হয়েছে দখল ও ভরাটের কারণে। নদীগুলোর পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, অনেক
জায়গায় এর দুর্গন্ধে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। শহর ঢাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত
অসংখ্য খালও এখন আর নেই। ঢাকার প্রকৃতিকে পুনর্জীবিত করতে হলে অবিলম্বে উচ্ছেদ
অভিযানের মাধ্যমে খালগুলো উদ্ধার করে সেগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ সচল করতে হবে। এ ছাড়া
বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে
হবে। শহরের ভেতরে হাতিরঝিলের মতো আরও কৃত্রিম লেক ও জলাধার সৃষ্টি করা গেলে তা
কেবল ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকেই ধরে রাখবে না, বরং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্যও বজায়
রাখবে। একই সঙ্গে হাতির ঝিলের মতো ওয়াটার ট্যাক্সি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন যোগাযোগ
নেটাওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও পরিবেশ
দূষণের একটি বড় কারণ। প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও তার একটি বড় অংশ
সঠিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। প্লাস্টিক বর্জ্য খাল, নর্দমা ও নদীতে
গিয়ে জমা হচ্ছে। এতে যেমন পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি জীববৈচিত্র্যও
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রকণা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য
দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।
ঢাকার পরিবেশ ও আবহাওয়া পুনরুদ্ধারের
এসব মহাপরিকল্পনা সফল করতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং নাগরিক সচেতনতা
বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়
প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর একটি বড় অংশই পলিথিন ও
প্লাস্টিক বর্জ্য, যা ড্রেন, নালা ও জলাশয়ে গিয়ে পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি করছে।
উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘রিসাইক্লিং’
ব্যবস্থা করতে পারলে এই দূষণ বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য
প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাÑ
প্রথমত, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর
ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরনো ও দূষণকারী যানবাহন পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার,
পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর
নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে ইটভাটাগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে
এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নদী ও জলাশয় রক্ষায় জিরো
টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পবর্জ্য শোধনের বাধ্যবাধকতা
এবং নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নদী ও খালকে কেন্দ্র করে
একটি সমন্বিত নগর পরিবেশ পরিকল্পনা গ্রহণ করাও সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে জলাভূমি
সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শহরে পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সবুজ করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে
পারে।
চতুর্থত, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে
তুলতে হবে। বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো
উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার
কমাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা
বৃদ্ধি। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকদেরও। নদীতে বর্জ্য না
ফেলা, বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস
গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব
নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কেবল সরকারি খাতা-কলমের নীতিই যথেষ্ট নয়, পরিবেশ আইনের
কঠোর প্রয়োগ এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
জন্য একটি সুস্থ, সবুজ ও বাসযোগ্য ঢাকার নিশ্চয়তা দিতে আজই শুরু হোক আমাদের
সম্মিলিত প্রয়াস। মনে রাখতে হবে,
ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয় কার্যত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, এটি মূলত মানুষের সৃষ্টি।
তাই সমাধানও মানুষের হাতেই নিহিত। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কঠোর আইন প্রয়োগ, পরিবেশবান্ধব
উন্নয়ন এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়ে ঢাকা আবারও একটি বাসযোগ্য ও টেকসই নগরীতে পরিণত
হতে পারে।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা