× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদ্যুৎতের দাম: মানুষের আরেক দফা চাপ

শরিফুল খান প্লাবন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

 বিদ্যুৎতের দাম: মানুষের আরেক দফা চাপ

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত জুন ২০২৬ তারিখে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা তৈরি করেছে উদ্বেগ

গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধিÑ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৯.১১ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০.৬৩ টাকা। পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে আরও বেশিÑ ১৯.৮৫ শতাংশ। এই সিদ্ধান্ত জুন মাসের বিল থেকেই কার্যকর হয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ পরিবারের বাজেটে আঘাত হেনেছে।

এখানে বুঝতে হবে যে, এটি শুধুমাত্র একটি দাম বৃদ্ধি নয়। এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা কষাঘাতের মতো আঘাত করবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা ভাবুন। গরমের এই সময়ে ফ্যান, ফ্রিজ, লাইট, টিভি, ওয়াশিং মেশিন চালিয়ে মাসে ২৫০-৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। আগে যেখানে মাসিক বিল আসত ২,২০০-২,৫০০ টাকার মধ্যে, এখন সেটা সহজেই ২,৬০০-৩,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এটি শুধুমাত্র ৪০০-৫০০ টাকার বিষয় নয়; এটি মানসিক চাপেরও বিষয়। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই চাপ আরও তীব্র এবং বেদনাদায়ক। তারা যে কঠোর পরিশ্রম করে দিন শেষে ঘরে ফেরে, সেই ঘরের আলো এবং বায়ুচলন এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্রমশ বিদ্যুৎ শুধুমাত্র ধনী পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

ইতিবাচক দিক হিসেবে বিইআরসি পরবর্তীতে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য একটি সংশোধনী এনেছে। লাইফলাইন (০-৫০ ইউনিট) গ্রাহকদের জন্য দাম ৪.৬৩ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং প্রথম স্ল্যাব (০-৭৫ ইউনিট) ৫.২৬ টাকায় রাখা হয়েছে। এটি একটি স্বাগতসূচক পদক্ষেপ, যা দেখায় যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির প্রতি কিছুটা সংবেদনশীল। কিন্তু এই পদক্ষেপ সত্যিকারের সমস্যার সমাধান করে না; এটি লক্ষণের চর্চা করে, রোগের নিরাপদ চিকিৎসা করে না।

সরকারি যুক্তি স্পষ্ট এবং কিছু পরিমাণে বাস্তবসম্মতÑ ভর্তুকি কমানো। বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন খরচ প্রকৃতপক্ষে বেড়েছে। আমদানিকৃত জ্বালানি যেমন এলএনজি এবং তেল, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং সিস্টেম লসের কারণে প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই সমন্বয় ছাড়া বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। আইএমএফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবেও সরকারকে ভর্তুকি কমানোর চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই রয়েছে প্রকৃত সমস্যা। প্রশ্ন শুধুমাত্র এটি নয় যে খরচ বেড়েছে, বরং কেন এই খরচ এত বেড়েছে এবং এটি কমানোর জন্য কী করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা শুধুমাত্র বৈশ্বিক জ্বালানি দাম নয়; এটি হলো দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা এবং দুর্নীতির অবশেষ, যা বছরের পর বছর ধরে জমা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে এমন বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্টে, যেগুলো পূর্ণক্ষমতায় চলছে না। এই চার্জ প্রকৃতপক্ষে একটি গ্যারান্টি, যা নিশ্চিত করে যে একটি প্ল্যান্ট কম বা বেশি উৎপাদন করুক না কেন, সরকার এবং ভোক্তারা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। এই ব্যবস্থা যদিও প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য প্রণীত, তবুও এটি অদক্ষতা এবং উদ্বায়ী খরচের জন্য একটি আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতে রিজার্ভ মার্জিন ৬০ শতাংশের ওপরে, যা অত্যন্ত বেশি। এই সংখ্যা প্রকাশ করে যে খাতে উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। তথাপি, লোডশেডিং এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি, যা সিস্টেমের বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনায় গভীর সমস্যা নির্দেশ করে।

এই মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক তরঙ্গ সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে গেছে, এখন তাদের বাজেটের পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হবে। খাদ্য, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার বাজেট কমিয়ে বিদ্যুৎ বিলের দাবি মেটাতে হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শিল্প এবং ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও জটিল। গার্মেন্ট শিল্প, যা দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী, ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চাপ অনুভব করছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি তাদের উৎপাদন খরচ আরও বাড়াবে, যা পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতায় সমস্যার সৃষ্টি করবে। ছোট এবং মাঝারি শিল্প এবং দোকানপাটের জন্য এটি হুমকিস্বরূপ, কারণ তারা বড় শিল্পের মতো উৎপাদন দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।

কৃষি খাতও এই সংকটের শিকার। সেচের জন্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে এবং দাম বৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দেবে। যখন কৃষক ফসলের দাম পায় স্থিতিশীল বা হ্রাসমান, তখন খরচের বৃদ্ধি তাদের লাভ হ্রাস করে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে।

গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল অপরিসীম। স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতাÑ এই তিনটি মূলমন্ত্র নিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিদ্যুৎ খাতে সংস্কারেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জনগণ বুঝতে পারে যে বাস্তব সমস্যা রয়েছে এবং সমাধানের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কিন্তু তারা আশা করেছিল, সেই সিদ্ধান্তগুলো ন্যায্য এবং সমন্বিত হবে।

দাম বাড়ানো যদি সত্যিকারের সংস্কারের অংশ হয়Ñ যেমন ক্যাপাসিটি চার্জ যুক্তিসঙ্গত করা, দুর্নীতি সম্পূর্ণভাবে দমন করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক করা তাহলে সাধারণ মানুষ কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। কিন্তু যদি শুধুমাত্র ভর্তুকি কমিয়ে খরচ জনগণের ওপর চাপানো হয়, তবে এটি আর একটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ থাকে না, জনগণের জন্য হয়ে ওঠে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

বিদ্যুৎ খাতকে সত্যিকারের সংস্কার করতে হলে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, পুরো বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক হিসাব সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে জনসমক্ষে আনা অপরিহার্য। কোন প্ল্যান্ট কত টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছে, তার উৎপাদন ক্ষমতা এবং প্রকৃত উৎপাদন কীÑ এসব তথ্য জনগণের জানার অধিকার আছে।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত এবং বৃহৎ পরিমাণে বিনিয়োগ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, রুফটপ সোলার, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উপায় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল। এই খাতে বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখতেও সাহায্য করবে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ বিতরণে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। সিস্টেম লস কমিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক সময়ে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে। এটি সিদ্ধান্তমূলক অবকাঠামো উন্নতির মাধ্যমে সম্ভব।

চতুর্থত, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লাইফলাইন ট্যারিফ আরও সুরক্ষিত এবং কার্যকর রাখা এবং মধ্যবিত্তের জন্য কিছু স্বল্পমেয়াদি রিলিফ প্যাকেজ বিবেচনা করা। বিদ্যুৎ আর বিলাসিতা নয়। আধুনিক সমাজে এটি মৌলিক চাহিদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যেন আরও দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।


শরিফুল খান প্লাবন

লেখক ও সাংবাদিক


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা