সাঈদ বারী
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫৭ মিনিট আগে
রাজনীতি নিয়ে লেখা অধিকাংশ নিবন্ধই সাধারণত ঘটনা, পরিসংখ্যান কিংবা বিশ্লেষণ দিয়ে শুরু হয়।
কিন্তু প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খানের ‘টিম তারেক এবং সময়ের দাবি’ শীর্ষক লেখাটির শুরুটা ভিন্ন। একটি আবেগঘন পারিবারিক স্মৃতি দিয়ে লেখক পাঠককে এমন এক পরিবেশে নিয়ে গেছেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে একজন পুত্র, একজন স্বামী এবং একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখা যায়। ২০১৪ সালে দীর্ঘ ছয় বছর পর মা ও ছেলের সাক্ষাৎ এবং বিদায়ের মুহূর্তে রসবোধের মাধ্যমে ভারাক্রান্ত পরিবেশকে হালকা করে দেওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি স্মৃতিচারণ নয়, বরং একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের পরিচয়।
তবে লেখাটির মূল
আবেদন অন্য জায়গায়। একটি ছোট্ট ঘটনার সূত্র ধরে মারুফ কামাল খান (সে সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন
খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব) আমাদের সামনে নেতৃত্বের একটি চিরন্তন সত্য তুলে ধরেছেন। সেই
সত্য হলো, কোনো নেতা একা সফল হন না। একজন নেতার সাফল্যের পেছনে থাকতে হয় একটি দক্ষ,
বিশ্বস্ত, কর্মঠ এবং দূরদর্শী টিম।
বিশ্ব ইতিহাসের
দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব নেতা কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেননি, বরং রাষ্ট্রনায়কের
মর্যাদা অর্জন করেছেন, তাদের প্রায় সকলেরই ছিল শক্তিশালী টিম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সংকটময় সময়ে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল শুধু তার অনবদ্য বক্তৃতার
জন্য স্মরণীয় নন; তিনি এমন এক নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে দক্ষতা ও যোগ্যতা
ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। একইভাবে সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ উপলব্ধি করেছিলেন
যে, একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে সৎ, মেধাবী ও দক্ষ মানুষদের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে
নিয়ে আসতে হবে। তার সাফল্যের পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত ও যোগ্য টিম।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাসেও এই সত্যের ব্যতিক্রম দেখা যায় না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম
বৈশিষ্ট্য ছিল যোগ্য মানুষকে খুঁজে বের করার অসাধারণ দক্ষতা। তিনি শুধু রাজনীতিবিদদের
মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং বিভিন্ন পেশাগত
ক্ষেত্র থেকে মেধাবী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত করেছিলেন। সে
কারণেই তার গঠিত দল ও সরকারকে অনেকে ‘গ্যালাক্সি অব স্টারস’ বা নক্ষত্রপুঞ্জ বলে অভিহিত
করতেন। নেতৃত্বের একটি বড় গুণ হলো নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সেই সীমাবদ্ধতা
পূরণের জন্য যোগ্য মানুষদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা। জিয়াউর রহমান সেই গুণের পরিচয় দিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে দেশনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়াও এক ভিন্ন বাস্তবতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন,
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি একটি
বিস্তৃত টিমের ওপর নির্ভর করেছিলেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেই
নয়, বরং একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্লাটফর্ম হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিল। নব্বইয়ের
গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় তার পাশে থাকা রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের
অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্বের বড় শক্তি এখানেই যে, একজন নেতা নিজের চারপাশে এমন
মানুষদের সমবেত করেন, যারা সংকটকালে দায়িত্ব নিতে সক্ষম।
তবে ইতিহাস আমাদের
এটাও শেখায় যে, সব টিম সমানভাবে সফল হয় না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বের
চারপাশে অযোগ্য, সুবিধাবাদী কিংবা স্বার্থান্বেষী মানুষ ভিড় করতে পারে। তখন সিদ্ধান্ত
গ্রহণের গুণগত মান কমে যায়, সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয় এবং নেতাকেও তার মূল্য দিতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অভিজ্ঞতার উদাহরণও কম নয়। ফলে নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে
বড় চ্যালেঞ্জ শুধু টিম গঠন নয়, বরং সেই টিমকে নিয়মিত মূল্যায়ন ও পরিশোধন করা।
এই প্রেক্ষাপটে
‘টিম তারেক’ প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপি এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে প্রজন্মান্তরের
যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন তারেক রহমান। স্বাভাবিকভাবেই তার নেতৃত্বের
সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে তিনি কী ধরনের মানুষকে দায়িত্ব দিচ্ছেন, কাদের ওপর আস্থা
রাখছেন এবং কীভাবে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টিমকে পরিচালনা করছেন তার ওপর।
পেশাগত কারণেই
বিএনপির রাজনীতি খুব কাছে থেকে দেখা মারুফ কামাল খান যথার্থভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন
যে, রাজনীতিতে দৃশ্যপটও একটি ভাষা। একজন নেতার পাশে কারা আছেন, কারা তার আস্থাভাজন,
কারা নিয়মিত পরামর্শ দেনÑ এসব বিষয় জনগণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কারণ মানুষ জানে,
অনেক সময় মঞ্চে দৃশ্যমান ব্যক্তির চেয়ে নেপথ্যের মানুষরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি প্রভাব
বিস্তার করেন। সুতরাং একজন নেতার ভাবমূর্তি এবং তার প্রশাসনের কার্যকারিতা অনেকাংশে
নির্ভর করে তার সহচরদের গুণমানের ওপর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
সত্য হলো, টিমের কোনো সদস্যের অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত নেতাকেই
বহন করতে হয়। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে একজন জনপ্রিয় নেতার অর্জন ম্লান
হয়ে গেছে তার আশপাশের মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে। আবার এমন উদাহরণও আছে যেখানে দক্ষ
ও সৎ সহযোগীদের কারণে একজন নেতা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন।
সুতরাং নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত
পরীক্ষা শুরু হয় বিজয়ের পর। তখন প্রয়োজন হয় এমন একটি টিম, যারা শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য
নয়, দক্ষতা, সততা, কর্মক্ষমতা এবং দূরদর্শিতার সমন্বয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে কাজ
করতে সক্ষম।
সবশেষে বলা যায়,
ব্যক্তি যত বড়ই হোন না কেন, ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নেন তারাই, যারা নিজেদের চারপাশে
যোগ্য মানুষদের সমবেত করতে পারেন। একজন নেতা তখনই রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন, যখন তিনি
ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠান, দক্ষতা এবং সুশাসনের সংস্কৃতি গড়ে
তোলেন। সেই অর্থে একজন নেতার প্রকৃত শক্তি তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার গড়ে
তোলা টিমের মধ্যেই নিহিত থাকে।
‘টিম তারেক’ নিয়ে
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেইÑ সফল নেতৃত্বের ভিত্তি ব্যক্তির
ক্যারিশমা নয়, বরং যোগ্য মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি কার্যকর, সৎ ও দূরদর্শী টিম।
লেখাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এর লেখকসত্তা। কারণ লেখাটি লিখেছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একেবারে নিকটবর্তী কর্মপরিসরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শুধু ক্ষমতাসীন অবস্থার খালেদা জিয়াকে দেখেননি, বরং বিরোধীদলীয় নেত্রী ও রাজনৈতিক সংকটময় সময়ের খালেদা জিয়াকেও কাছ থেকে দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং ক্ষমতার বাইরে, উভয় সময়েই তিনি তার প্রেস উইংয়ের নেতৃত্বের আসনে ছিলেন। ফলে নেতৃত্ব, টিম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সাঈদ বারী
প্রকাশক ও কলাম লেখক