সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশ-বিদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রাথমিক রায় হয়েছে গত রবিবার।
রায়ে ধর্ষক ও হত্যাকারী সোহেল রানা এবং তাকে সহযোগিতাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় দিয়েছেন আদালত। ওইদিন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় দেন। রায় প্রদান উপলক্ষে আদালত ঘিরে উচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আদালত ছিল জনাকীর্ণ। রায়ের পর নিহত রামিসার বাবা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি শতভাগ খুশি, এখন শুধু দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই।’ প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানিয়েছে, রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরজুড়ে সমবেত মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে একটি কথাইÑ ‘যুগান্তকারী রায়’। শুধু আদালত চত্বর নয়, সারা দেশ এমনকি বহির্বিশ্বেও স্মরণকালের নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের রায়ের ব্যাপারে একই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
হত্যা-ধর্ষণসহ
লোমহর্ষক নৃশংসতার বিচারিক কার্যক্রমে আমাদের দেশের দীর্ঘসূত্রতার ‘ঐতিহ্যের’ বিপরীতে
রামিসা খুনের দ্রুত বিচার ব্যতিক্রমীই শুধু নয়, আশা জাগানিয়াও বটে। যেখানে একটি হত্যা
বা ধর্ষণের তদন্তকাজ শেষ করতে কয়েক বছর পেরিয়ে যায়, সেখানে মাত্র ২৩ দিনের মাথায় বিচার
সম্পন্ন হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা। বলা নিষ্প্রয়োজন, রাষ্ট্র ও সরকার যথাযথ সক্রিয় হওয়ার
কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে, সরকার বা রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে কোনো বিচারকাজই
বছরের পর বছর আদালতের ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকতে পারে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিশু রামিসার
নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাসায় গিয়ে শোকার্ত স্বজনদের
আশ্বাস দিয়েছিলেনÑ ‘এক মাসের মধ্যে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে।’ যদিও বিচার
প্রক্রিয়ায় সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকার কথা নয়, তবে মামলার তদন্ত
ও বিচারকার্যের গতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের
কথা অস্বীকার করা যাবে না। পাশাপাশি সরকারের হস্তক্ষেপে বহু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা
ধামাচাপা পড়ে যাওয়া কিংবা দায়সারা তদন্ত শেষে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার নজিরও আমাদের দেশে
রয়েছে। এর ফলে মামলা, তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা
প্রবল হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে
শিশু রামিসা হত্যার তদন্ত ও বিচার দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হওয়ায় জনমনে ধারণা সৃষ্টি হলো,
রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই এটা সম্ভব। তবে এখানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনমতের প্রবল
চাপের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। রামিসা হত্যার খবর প্রচারিত হওয়ার পর তা এত দ্রুত
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে যে, ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে সর্বত্র। জনমতের এমন চাপ কোনো গণতান্ত্রিক
সরকারের পক্ষেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। জনমতের প্রবল চাপের বিষয়টি
সরকার তথা রাষ্ট্রকে তাড়িত করেছে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার ব্যবস্থা
করতে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানত দায়বদ্ধতা থাকে নির্বাচকমণ্ডলী তথা জনগণের
কাছে; যা অনির্বাচিত বা প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় জেঁকে বসা সরকারের থাকে
না। নিকট অতীতের স্বনির্বাচিত সরকারটির আমলে দেশের বিচারব্যবস্থায় যে অনিয়ম-দুর্নীতির
শিকড় গজিয়েছে, তার মূলোৎপাটন এ সরকার করবেÑ এমন প্রত্যাশা সবার। রামিসার হত্যার বিচারের
মধ্য দিয়ে সে প্রত্যাশার পথ প্রশস্ত হলো।
বিচার সম্পর্কে
দুটি প্রবচন খুব প্রচলিত। একটি হলোÑ ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’, অপরটি হলো
‘জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’। প্রথম প্রবচনটির বাংলা তরজমা হলোÑ বিলম্বিত বিচার
হলো বিচার অস্বীকার করারই নামান্তর। আর দ্বিতীয়টির বঙ্গানুবাদ হলোÑ বিচারের নামে তাড়াহুড়ো
বা অতিদ্রুততা করলে প্রকৃত ন্যায়বিচার চাপা পড়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের প্রাক্তন
প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম এওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন সেদেশের পার্লামেন্টে এক বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে
উক্তিটি করেছিলেন। এর মর্মার্থ হলো- কোনো অপরাধের বিচারে তাড়াহুড়ো করা হলে তদন্তের
ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি কিংবা অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে বিচারপ্রার্থী কিংবা অভিযুক্ত
উভয়েরই ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতায়
অপরাধের অনেক তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়া বা নথিপত্র গায়েব হওয়ার কারণে ন্যায়বিচার করা
অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক সময় নৃশংসতার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও বেকসুর খালাস পেয়ে
যায়। আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
এরপরও আমরা মনে করি, রামিসা হত্যার বিচার দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে রাষ্ট্র এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। দেশবাসীর মতো আমরাও বিশ্বাস করি যে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। কাউকে তুষ্ট করার জন্য বা কারও ভয়ে ভীত হয়ে নয়, বরং দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় থেকেই রাষ্ট্র তার পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশাবাদী হতে চাই, ভবিষ্যতেও রাষ্ট্র যেকোনো অপরাধের বিচারকাজ ত্বরান্বিত করে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে সৃষ্ট হতাশা দূর করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে আমরা রামিসা হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করারও দাবি জানাই। রাষ্ট্রপক্ষ অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে, তিন মাসের মধ্যে এ রায় কার্যকর করা হবে। তাদের দেওয়া আশ্বাসে দেশবাসী নিশ্চয়ই আস্থা স্থাপন করবে। এর ধারাবাহিকতায় আগামীতে বাংলাদেশ পরিচিত হোক ন্যায়বিচারের দেশ হিসেবে।