× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আঙ্কারা-ইসলামাবাদ নতুন রসায়ন

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্য এমন এক ভূখণ্ড, যা শান্তি অপেক্ষা যুদ্ধ এবং স্থায়িত্ব অপেক্ষা অনিশ্চয়তাকে বেশি ধারণ করেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম সীমান্ত থেকে শুরু করে আজকের বহুমাত্রিক প্রক্সি যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যেন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। সাম্প্রতিককালে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ বাহিনী যখন ইরানের সামরিক অবকাঠামো এবং পরমাণু স্থাপনা লক্ষ করে প্রায় ৯০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালায়, তখন পুরো অঞ্চল এক নজিরবিহীন মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়। বিশ্ব দেখল ইরানের প্রধান পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালীর দুই সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়া। কিন্তু এই তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আকস্মিকভাবে হামলা বন্ধের এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেÑ এই সংকটের শেষ কোথায়? আমেরিকার এই হঠাৎ নমনীয়তার পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলটি ঠিক কী?

 

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের শেষ কোথায়?

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কোনো সুনির্দিষ্ট বা গাণিতিক অবসান নেই। এর কারণ এই অঞ্চলের সংকটগুলো কোনো একক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে মূলত তিনটি বড় ধরনের দ্বন্দ্ব :

১. ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে কোনো একক স্বাধীন ও শক্তিশালী পারমাণবিক বা সামরিক প্রতিপক্ষ দেখতে চায় না। ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ (যেমন : হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি) নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাপ্তি সম্ভব নয়।

২. ঐতিহাসিকভাবে ইরান এবং আরব বিশ্ব এর মধ্যকার নেতৃত্ব ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলকে শান্ত হতে দিচ্ছে না।

৩. আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন না ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের একটি স্থায়ী, স্বাধীন এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বা ‘টু-স্টেট সলিউশন’ নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে টেকসই শান্তি অধরাই থেকে যাবে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল যুদ্ধের বিরতি দেয়, কিন্তু সংকটের মূল উপড়ে ফেলতে পারে না।

৪. ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয় এবং মে মাসের শেষ নাগাদ একটি চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেন যে, আমেরিকা হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার শর্তে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কঠোর নজরদারিতে রাখার শর্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখছে, তখন অনেকেই একে শান্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। তবে গভীর সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, এই ‘হামলা বন্ধের ঘোষণা’ মূলত এক সুদূরপ্রসারী মার্কিন কৌশল।

৫. মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের নৌবহর ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন’। ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করার পর এখন ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।

৬. পাকিস্তান মারফত মার্কিন প্রশাসন ইরানের কাছে যে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, তার গভীর অর্থ হলো ইরানকে শর্তহীনভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে নতি স্বীকার করানো। মার্কিন শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ মজুদ ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিকাশ বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ করা। হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে আমেরিকা আসলে ইরানকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, শর্ত না মানলে এর চেয়েও বিধ্বংসী আক্রমণ চালানো হবে।

৭. ট্রাম্প প্রশাসনের আসল চালটি পরিষ্কার হয় যখন তিনি মে মাসের শেষের দিকে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ঘোষণা করেন যে, ইরানের সাথে যেকোনো স্থায়ী চুক্তি হতে হলে সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান এবং বিশেষ করে পাকিস্তান ও তুরস্ককে বাধ্যতামূলকভাবে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ সই করতে হবে। অর্থাৎ, সামরিক হামলার ভয় দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান মুসলিম শক্তিগুলোকে ইসরায়েলের একক আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করাই আমেরিকার আসল কৌশল।

৮. দীর্ঘ সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছিল, যা আমেরিকার নিজস্ব অর্থনীতি এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের জন্য মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি ডেকে আনছিল। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। হামলা সাময়িক বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালী চালু করা আমেরিকার নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি ছিল।

৯. দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভূ-রাজনৈতিক কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সব সময় একটি স্পর্শকাতর অবস্থানে থাকে। ২০২৬ সালের ইরান-আমেরিকা সংঘাতের সময় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং দ্বিমুখী। ইসলামাবাদ এখানে এক অত্যন্ত ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রেখে চলেছে।

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যখন সরাসরি আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনির মার্কিন প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেন। পাকিস্তানের অনবদ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটনের ১৫ দফা প্রস্তাব তেহরানে এবং তেহরানের ১০ দফা পাল্টা প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, পাকিস্তানের অনুরোধেই তিনি ইরানের ওপর চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দুই সপ্তাহের জন্য পিছিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। পাকিস্তান কেন এই মধ্যস্থতা করছে? কারণ ইরানের সাথে পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ ৯০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। ইরানে স্থায়ী যুদ্ধ লাগলে পাকিস্তানের ভেতরে শিয়া-সুন্নি অভ্যন্তরীণ দাঙ্গা লাগার ঝুঁকি রয়েছে এবং লাখ লাখ ইরানি শরণার্থীর চাপ পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি নিতে পারবে না।

১০.পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের ভূমিকা কেবল শান্তিরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Strategic Mutual Defence Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণকে পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির JF-17 Thunder Block III যুদ্ধবিমান এবং চীনের তৈরি আধুনিক HQ-9 সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি সৌদি আরবে মোতায়েন করে। এটিই সৌদি আরবের মাটিতে প্রথম কোনো মার্কিন জোটের বাইরে ভিন্ন কোনো দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্লেষকরা একে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একাধিপত্যের বিকল্প হিসেবে একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ (Islamic NATO) গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন।

১১. বর্তমান মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে সাধুবাদ জানালেও বিনিময়ে এক কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন চায় পাকিস্তান যেন ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রচণ্ড ইসরায়েল-বিরোধী জনমত থাকায় এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থানের কারণে ইসলামাবাদ এখন এক চরম কূটনৈতিক ফাঁদে পড়েছে। একদিকে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য ও আইএমএফ (IMF) ঋণের জন্য ওয়াশিংটনকে চটানো সম্ভব নয়, অন্যদিকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে দেশের ভেতরে গৃহযুদ্ধ বা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

১২. মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও শিল্পোন্নত দেশ তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এবং অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। তুরস্কের এই নীতিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বলা হচ্ছে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বা Strategic Ambiguity। তুরস্ক ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করেছে। এরদোয়ান খোলামেলাভাবে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলাকে ইরানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ‘আগুনের বৃত্তে’ (Circle of Fire) পরিণত করবে। এমনকি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইরান থেকে উড়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যখন তুরস্কের ইনসিরলিক বিমান ঘাঁটির (যেখানে মার্কিন সেনা রয়েছে) দিকে আসছিল, তখন তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা ধ্বংস করে। তুরস্ক যুদ্ধের বিস্তার চায় না, কারণ এটি তাদের নিজস্ব পর্যটন, বাণিজ্য এবং জ্বালানি আমদানির ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে।

১৩. ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ সৌদি আরবের রিয়াদে এক ঐতিহাসিক বৈঠকের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মিসরÑ এই চারটি বড় মুসলিম দেশ মিলে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বা ‘চতুর্ভুজ ব্লক’ গঠন করে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কের আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে (Antalya Diplomacy Forum) এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেন। তুরস্কের মূল উদ্দেশ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা যেন কোনো বহিরাগত শক্তি (আমেরিকা বা রাশিয়া) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যুদ্ধের এই ডামাডোলের মধ্যেও তুরস্ক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া অন্যতম প্রধান দেশ। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর নৌপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় তুরস্ক তাদের ‘মিডল করিডোর’ (Middle Corridor) নামক বাণিজ্য পথটিকে বিশ্ববাসীর কাছে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে, যা চীন ও মধ্য এশিয়া থেকে ইরান-ইউক্রেন এড়িয়ে সরাসরি ইউরোপে পণ্য পৌঁছে দেয়। এ ছাড়া এই যুদ্ধের সুযোগে তুরস্ক সৌদি আরব, কাতার ও আবুধাবির কাছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করছে, যা তুরস্কের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করছে।

১৪. মধ্যপ্রাচ্য সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেউ সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে চায় না, আবার মার্কিন-ইসরায়েলি একাধিপত্যকেও বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।

এই দুই দেশের সমন্বিত প্রয়াসই মূলত মধ্যপ্রাচ্যকে ২০২৬ সালের মে মাসে একটি বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা করে যুদ্ধবিরতির টেবিলে নিয়ে এসেছে। তবে ইসরায়েল এই পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের কূটনৈতিক ও সামরিক উত্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। তেল আবিবের উগ্রপন্থী নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করেন, ইরানকে দুর্বল করার পর ইসরায়েলের পরবর্তী নিশানা হতে পারে তুরস্ক অথবা পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের এই তৎপরতা কেবল ইরানকে বাঁচানোর জন্য নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও একটি আগাম প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট আজ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক দাবার চাল বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আমেরিকার হামলা বন্ধের ঘোষণা কোনো স্থায়ী শান্তির বার্তা নয়, বরং এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন কৌশলগত রূপান্তর, যার লক্ষ্য যুদ্ধ ছাড়াই প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও বশীভূত করা। আর এই সংকটের অন্তরালে পাকিস্তান ও তুরস্ক যেভাবে নিজেদের সামরিক ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করছে, তা আগামী দিনের বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ নির্দেশ করে। তবে যতদিন পর্যন্ত বিশ্ব পরাশক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে তাদের অস্ত্র বিক্রির বাজার এবং তেলের খনি হিসেবে দেখা বন্ধ না করবে এবং যতদিন না ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা দীর্ঘদিনের অবিচারের অবসান ঘটবে, ততদিন এই গোলকধাঁধার কোনো শেষ নেই। সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেঘ কেটে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে আবার নেমে আসতে পারে যুদ্ধের কালো ছায়া। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এখন বুঝতে হবে যে, শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়েই কেবল মধ্যপ্রাচ্যের এই তপ্ত বালুকে শান্ত করা সম্ভব, অন্যথায় এই আগুনের লেলিহান শিখা একদিন পুরো বিশ্বকেই গ্রাস করবে।


শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা