× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যে কারণে রাষ্ট্র সংস্কার দরকার

নূরুদ্দীন দরজী

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বর্তমান সমাজে চলছে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও মবতন্ত্রের মতো কর্মকাণ্ড। সাধারণ মানুষ দুর্বৃত্তের কাছে বন্দি।

এ অবস্থার শেষ কবে হবে কারও জানা নেই। দ্ধিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী এক দানবীয় মূর্তি ধারণ করেছিল। হিটলারের নিষ্ঠুর আচরণ ও তাণ্ডব পৃথিবীতে মানুষের শান্তি দারুণভাবে বিনষ্ট করে দিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটা তাই। বর্তমান নির্বাচিত সরকার জনশান্তি ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও হিমশিম খাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে গঠন, রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুতারোপ করেছেন। হাসিনা-পরবর্তী ১৮ মাসের শাসনে যে জঞ্জাল তৈরি হয়েছে তা দূর করা নিতান্তই দুরূহ কাজ। জনগণ মনে করেছিল শান্তিতে নোবেলজয়ীর হাতে দেশ নিরাপদ থাকবে। ন্যায়, সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু জনগণের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মূলে আঘাত করা হয়েছে । ১৮ মাসে মানুষের মুক্তির কথা বলে বলে ক্ষমতা ভোগের অন্তরালে মিথ্যার চর্চা হয়েছে। মবোক্র্যাসি, জবরদস্তি ও প্রতারণা এমনভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যা নিয়ন্ত্রণে আনা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের অনেকে মুখে নীতি ও আদর্শের কথা বললেও তারা বিত্তবৈভব গড়েছে। অপকর্ম ও দুর্নীতির কথা শুনলে আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার উপক্রম হয়। দিনের পর দিন অপকীর্তির নতুন নতুন খবর পাচ্ছে মানুষ। এ সমস্ত দুর্নীতিবাজের কারণে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশকে পুনর্গঠনের জন্য নতুনভাবে চিন্তা করতে হচ্ছে। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ আমাদের পরে স্বাধীনতা লাভ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছে। যেখানে মন্টিনিগ্ৰো, সার্বিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের পর স্বাধীন হয়ে আশান্বিত উন্নয়ন করে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে দেশ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের কথা। মানুষ এমনিতেই সহজাতভাবে স্বার্থবাদী, লোভী ও অপরাধপ্রবণ। তার ওপর বিগত দিনের অনাচার ও অপরাধ জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘি ঢেলেছে । রাষ্ট্রের বড় আসনে বসে যারা এ সমস্ত অপকর্ম চালায় সেইসব রাষ্ট্রের অবস্থা এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন অবস্থায় ভালো কিছু আশা করা যায় না।

 সমাজে বসবাসকারী সকল মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক বিবেচনা একরকম থাকে না। অনেক দার্শনিকের মতে, জ্ঞানের ৬টি স্তরÑ সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি, অলৌকিক জ্ঞান, অভ্যন্তরীণ জ্ঞান, দার্শনিক জ্ঞান ও অতি সাধারণ জ্ঞানে বিভাজিত। এ সমস্ত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সমগ্ৰ প্রাণিজগৎকে আবার ৬ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কোনো প্রাণীর একটি, কারও দুইটি, তিনটি, চারটি, পাঁচটি ও কারও ছয়টি জ্ঞান আছে। প্রাণী মাত্রই জ্ঞানের অধিকারী। উদাহরণস্বরূপ, গাছের প্রাণ আছে, তাই গাছের জ্ঞানও আছে। গাছের একটি জ্ঞান আছে, আর তা হচ্ছে গাছের খাদ্যগ্ৰহণ করতে পারা। এটি অভ্যন্তরীণ জ্ঞান। কেঁচোর দুইটি জ্ঞান আছেÑ খাদ্যগ্ৰহণ ও জৈবিক কাজ করতে পারে। তিনটি জ্ঞান আছে কিছু প্রাণীর। চারটি জ্ঞানের স্তর আছে পৃথিবীর অনেক প্রাণীর মধ্যে এবং এরা মানুষ, বানর, গরিলা, হনুমান ও শিম্পাঞ্জি। পাঁচটি জ্ঞান অশরীরী জিনেরা এবং ছয়টি জ্ঞানের স্তর রয়েছে একমাত্র শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে, যারা ধর্ম প্রবর্তক ও বিজ্ঞানী। এদের কারণেই মানুষ নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ জীব দাবি করতে পারছে। মানুষ মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় জ্ঞান থাকে একটি এবং এটি অভ্যন্তরীণ জ্ঞান। অভ্যন্তরীণ জ্ঞান লোপ পেলে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। দুটি জ্ঞানের মানুষ নির্বোধ, তিনটির নির্বোধ হলেও কিছুটা বুদ্ধি দেখা যায়। চারটি জ্ঞানের মানুষ বুদ্ধিমানÑ এ শ্রেণির সংখ্যা প্রায় ৯৯. ৯৯ ভাগ মনে করা হয়। পাঁচটি জ্ঞানের অধিকারী মানুষ কবি, সাহিত্যিক,অলি আউলিয়া, সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে থাকেন। ছয়টি জ্ঞান যাদের আছে তারা ধর্ম প্রবর্তক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক। এখানে দ্রষ্টব্য যে, চারটি জ্ঞানের অধিকারী মানুষের মতো চারটি প্রাণীও আছে। এরা বানর, গরিলা, হনুমান ও শিম্পাঞ্জি। এরা সমজ্ঞানের অধিকারী হয়েও বনে-জঙ্গলে বসবাস করে। কারণ তাদের মধ্যে মানুষের মতো ধর্ম প্রবর্তক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক নেই, কেউ তাদের উন্নত পথ প্রদর্শন করতে পারে না।

সম্মানিত পাঠকদের সামান্য গল্প শোনানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিনীতভাবে বলছি যে, ওই সমস্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরির মানুষকে নিয়েই সমাজ চলে, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। এরই মাঝে যদি কেউ সর্বনাশের বীজ রোপণ করে, নীতি বিবর্জিত রাজনীতি করে, আদর্শ ও নৈতিকতা জলাঞ্জলি দেয়, সমাজব্যবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে দেখার বিষয়। তখন শান্তির ললিত বাণী কেন ব্যর্থ পরিহাসে পরিণত হবে না? এ সমস্ত কারণে সময়ে সময়ে জাতির ললাটে বিভিন্ন দুর্ভাগ্য ভর করে এসে তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে ফেলে। রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ে জনগণের ক্ষতি করতে জগদ্দল পাথরের মতো বসে পড়ে, মিথ্যা ও প্রতারণার সুকৌশলী ফাঁদ পেতে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করে তারা অর্জিত সাফল্যকে ধ্বংস করে দেয়। মুখে মধু আর অন্তরে বিষ নিয়ে বাকপটুতায় আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। জনগণ জাগরিত হয়ে যখন একাতাবদ্ধ হয় তখন বসন্তের কোকিল ধ্বজাধারীরা কেটে পড়ে, সরে যায়। কিন্তু কিছু মানুষে মানুষে থেকে যায় মিথ্যাচারের বীজ। এ সমস্ত অবাঞ্ছিত কুফসল ফলে ফলে রাষ্ট্র তথা সমাজকে ক্রমান্বয়েই নষ্ট করে ফেলে। বিগত সময়ে বাংলাদেশের মানুষ এমন বিপদে নিপতিত হয়েছে। যার জন্য আমাদের এখন ত্রাহি ত্রাহি ও করুণ দশা । এ দুরবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য প্রশাসন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। বিশেষ করে, বিচারব্যবস্থায় আনতে হবে স্বচ্ছতা। আর তা ওপর থেকেই শুরু করা উচিত।

সুষ্ঠু বিচারের উদাহরণ মানুষের বিবেকের জাগরণ ঘটায়। আর তা পরিবার থেকেই শুরু করা দরকার। শিষ্টাচার শিক্ষা ও চর্চা করা প্রতিটি পরিবারের অবশ্য দায়িত্ব, যা করতে হয় মুরুব্বিদের। পরিবার রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক হলেও তার ওপর ভিত্তি করেই আসে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, শান্তি, সততা ও উন্নয়ন। পরিবারের ভালো-মন্দ রাষ্ট্রকে দারুলভাবে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর সকল ভালো-মন্দ মানুষের জন্ম কোনো না কোনো পরিবারে। পারিবারিক শিক্ষা সুনাগরিক গড়ে তুলতে পারে। মানুষের মানবিক গুণাবলির বিকাশ, সৎপথে চলা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, দয়া, ক্ষমা, প্রীতি, সম্প্রীতি, ধৈর্যশীল, দানশীল ও পরোপকারী করে তোলার শিক্ষদানের প্রথম প্রতিষ্ঠানই একেকটি পরিবার। অবশ্য জ্ঞানের স্তর বিবেচনায় সামান্য কিছু মানুষ আছে যাদের পরিবর্তন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে এদের পরিমাণ নিতান্তই অল্প। এদের কারণে যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতির সম্ভাবনাও কম।

 বিচারব্যবস্থা ওপর থেকে শুরু করা প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে ইংরেজ ইতিহাস ও শিক্ষাবিদ জন মেকলের কথা উল্লেখ্য। মেকলে ১৮৩৪ সালে ভারতে এসে চার বছর অবস্থান কালে এ দেশবাসীর শিক্ষার জন্য  ‘নিম্ন পরিস্রাবণ নীতি/ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিউরি চালু করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উচ্চশ্রেণি থেকে লেখাপড়া আরম্ভ করা। অর্থাৎ সমাজে যারা বিত্তশালী তারা আগে লেখাপড়া শিখবে এবং তাদের মাধ্যমে অন্যরা পড়াশোনা করবে। ভারতবাসী তা গ্ৰহণ না করলেও ওই নীতি মন্দের ভালো কিছু কিছু ফলাফল রয়ে গেছে। জন মেকলে আইনের জন্য কিছু সুপারিশ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আইনে পরিণত হয়েছে এবং এখনও বাংলাদেশ ও ভারতে কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশের নুয়ে পড়া অবস্থার উন্নতিকল্পে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে। ন্যায়ের পথে আনতে হলে সমাজের ওপর থেকেই শুরু করতে হবে। সচেতনতা আরও বৃদ্ধি করে সকল প্রকার অনাচার, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা আবশ্যক। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিচারব্যবস্থাকে নিজস্ব পথে চলতে দেওয়া। কোনো একসময় গ্ৰামে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু ছিল। গ্ৰাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ছোটখাটো বিচার গ্ৰামেই শেষ করা হতো। কোনো কোনো গ্ৰামে এমন ন্যায়বিচার করা হয়েছে, যার দৃষ্টান্ত এখনও মানুষের মুখে মুখে। ওই সময় তাৎক্ষণিকভাবে গ্ৰাম্য সালিশির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হতো বলে অপরাধপ্রবণতাও অনেক কম ছিল। দুর্বৃত্তরা ভয়ে ভয়ে থাকত, কখন জানি তাদের ডাক পড়ে ও বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক এলাকায় গ্ৰাম পঞ্চায়েত ও সালিশির বিচারকগণ ন্যায়বিচারের উদাহরণ স্থাপন করে গোল্ড মেডেলসহ নানাবিধ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। আমাদের সেইসব হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। 

 বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতির বসবাস রয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। কিন্তু এদেশবাসী নীতি-নৈতিকতা কখনও বিসর্জন দেয়নি। আত্মত্যাগী মনোভাবের জন্য তাদের আছে অসংখ্য ইতিহাস ও বীরত্বপূর্ণ কাজ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনের জাগরণ শুরু হয়েছিল বাংলার মাটি থেকে। সে আমলের হাজী শরীয়ত উল্লাহ, দুদুমিয়া, সূর্যসেন, প্রীতিলতার বীরত্বের কথা সবার জানা। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো দৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই আমরা স্বাধীন স্বদেশভূমি পেয়েছি। এখন আমাদের দায়িত্ব দুর্নীতি-অনাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। 


নূরুদ্দীন দরজী 

কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষা অফিসার

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা